সোমবার, ২০ নভেম্বর, ২০১৭ ইং ৬ অগ্রহায়ণ, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ,১ রবিউল-আউয়াল, ১৪৩৯ হিজরী

আল্লাহর প্রতি ঈমান

AmaderIslam.COM
এপ্রিল ১৫, ২০১৭
news-image

ওয়ালি উল্লাহ সিরজ : হযরত মুয়ায বিন জাবাল (রা.) বলেন, কোন এক সফরে আমি রাসুল (সা.) এর পেছনে উটের ওপর বসা ছিলাম। আমার ও তাঁর মাঝে ঘোড়ার জিনের (কাঠের তৈরী আসন) পেছনের অংশটি ছাড়া আর কোন ব্যবধান ছিল না। তিনি বললেন, মুয়ায বিন জাবাল! আমি (আগের মতই) বললাম ইয়া রাসুলুল্লাহ, ভৃত্য উপস্থিত। এবারও তিনি কিছুই বললেন না। আবার কিছুদূর যাওয়ার পর তিনি ডাকলেন মুয়ায বিন জাবাল। আমি এবারও বললাম ইয়া রাসুলুল্লাহ, ভৃত্য উপস্থিত। তিনি বললেন, তুমি কি জান, বান্দাদের ওপর আল্লাহর হক (প্রাপ্য) কি? আমি বললাম, আল্লাহ ও তার রাসুলই ভালো জানেন। তিনি বললেন, বান্দাদের ওপর আল্লাহর হক এই যে, তারা কেবল তাঁরই হুকুম পালন করবে এবং হুকুম পালনে অন্য কাউকে শরীক করবে না। আরো কিছুদূর চলার পর তিনি বললেন, হে মুয়ায! আমি বললাম হে রাসূলুল্লাহ, ভৃত্য উপস্থিত, আপনার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনবো ও আনুগত্য করবো। তিনি বললেন, তুমি কি জান, আল্লাহর ওপর বান্দার হক (প্রাপ্য) কি? আমি বললাম, আল্লাহ ও তার রাসুলই ভালো জানেন। তিনি বললেন, আল্লাহর ওপর তাঁর অনুগত বান্দাদের হক এই যে, তিনি যেন তাদেরকে আযাব না দেন। (বোখারী ও মুসলিম)
হযরত মুয়াযের বর্ণনার সারমর্ম হলো, তিনি রাসুল (সা.) এর এত কাছে বসেছিলেন যে, কথা শুনতে ও শোনাতে কোনই অসুবিধা হচ্ছিল না। রাসুল (সা.) এর কথা তিনি খুব সহজেই শুনতে পাচ্ছিলেন। কিন্তু যে কথাটা রাসুলুল্লাহ (সা.) বলতে চাইছিলেন তা এত গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে, তিনি তাকে তিনবার ডাকলেন এবং কিছুই বললেন না। এর উদ্দেশ্য ছিল এই যে, মুয়ায যেন গভীর মনোযোগ দিয়ে কথাটা শোনেন এবং কথাটা যে কত গুরুত্বপূর্ণ, তা ভালোভাবে উপলব্ধি করেন। এরপর রাসুল (সা.) যা বললেন, তা থেকে সুস্পষ্ট হয়ে গেল যে, আল্লাহর একত্ব তথা তাওহীদ অত্যন্ত জরুরী এবং তা জাহান্নামের আযাব থেকে বাঁচাতে সক্ষম। যে জিনিস আল্লাহর গযব থেকে নিষ্কৃতি দেয় ও জান্নাতের হকদার বানায়, বান্দার কাছে তার চেয়ে মূল্যবান জিনিস আর কি হতে পারে?
রাসুলুল্লাহ (সা.) জিজ্ঞাসা করলেন, (আবুল কায়েস গোত্রের প্রতিনিধি দলকে) তোমরা জান, একমাত্র আল্লাহর ওপর ঈমান আনার অর্থ কি? তারা বললো, আল্লাহ ও তার রাসুলই ভালো জানেন। রাসুল (সা.) বললেন, এর অর্থ হলো, এই মর্মে সাক্ষ্য দেয়া যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই এবং মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর রাসুল, আর নামায যথাযথভাবে আদায় করা, যাকাত দেয়া ও রমযানের রোযা রাখা। (মেশকাত)
হযরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ (সা.) যখনই কোন ভাষণ দিতেন, একথাটা অবশ্যই বলতেন যে, যার ভেতরে আমানতদারী নেই, তার ভেতরে ঈমান নেই, আর যে ব্যক্তি ওয়াদা রক্ষা করাকে গুরুত্ব দেয় না, তার কাছে দ্বীনদারী নেই। (মেশকাত)
রাসুলুল্লাহ (সা.) এর এ উক্তির তাৎপর্য এই যে, যে ব্যক্তি আল্লাহর হক ও বান্দার হক আদায় করে না, সে পরিপূর্ণ ঈমানের অধিকারী নয়। আর যে ব্যক্তি কোন বিষয়ে ওয়াদা করে অথচ সেই ওয়াদা পূরণ করে না, সে দীনদারীর মতো মহামূল্যবান সম্পদ ও নেয়ামত থেকে বঞ্চিত। যার অন্তরে ঈমানের শেকড় দৃঢ়ভাবে বদ্ধমূল থাকে, সে সকল হক বা অধিকার আদায়ে বিশ্বস্ত হয়ে থাকে। এই বিশ্বস্ততাই আমানতদারী। কোন হক বা অধিকার আদায়ে সে অবহেলা করে না। অনুরূপভাবে, যে ব্যক্তির ভেতরে দ্বীনদারী থাকবে, সে মৃত্যু পর্যন্ত ওয়াদা পালন করবে। মনে রাখা দরকার যে, সবচেয়ে বড় হক বা অধিকার হচ্ছে আল্লাহর, তাঁর রাসুলের এবং তাঁর কিতাবের। আর আল্লাহর হক ও বান্দার হক কি কি, তার পুরো তালিকা আল্লাহ তায়ালা কোরআন মজীদেই দিয়ে রেখেছেন। আরো মনে রাখতে হবে যে, মানুষ আল্লাহ তায়ালার সাথে, তাঁর প্রেরিত নবীর সাথে ও নবীর আনীত দ্বীনের সাথে যে ওয়াদা করে, সেটাই সবচেয়ে বড় ওয়াদা। সুতরাং ওয়াদা পালনের ক্ষেত্রে এই ওয়াদা সবচেয়ে অগ্রগণ্য।
হযরত আমর ইবনে আবাসা (রা.)বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.) কে জিজ্ঞাসা করলাম, ঈমান কি? তিনি বললেন ঈমান, হচ্ছে সবর ও সামাহাতের আর এক নাম। (মুসলিম)
অর্থাৎ ঈমান হলো, আল্লাহর পথ অবলম্বন করা, এই পথে যত বিপদ মুসিবত আসুক, তা সহ্য করা এবং আল্লাহর সাহায্যের আশা নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়া। একেই বলা হয় সবর। আর নিজের উপার্জিত সম্পদ থেকে যত বেশি পরিমাণে সম্ভব আল্লাহর অসহায় ও পরমুখাপেক্ষী বান্দাদের ওপর আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে ব্যয় করা এবং ব্যয় করে তৃপ্তি ও আনন্দ অনুভব করা। আরবীতে একেই বলে সামাহাত। অবশ্যই সামাহাত বিনম্র আচরণ, মহানুভবতা ও উদারতা অর্থেও ব্যবহৃত হয়ে থাকে ।