মঙ্গলবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ইং ১১ আশ্বিন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ,৫ মুহাররম, ১৪৩৯ হিজরী

ইসলামী বিধানের পূর্ণ প্রতিফলনের জন্যই সুদমুক্ত ব্যাংক-বীমা প্রয়োজন

AmaderIslam.COM
এপ্রিল ২১, ২০১৭
news-image

ওয়ালি উল্লাহ সিরাজ: ইসলামী বীমা মূলত এক ধরনের সমবায়ী পদ্ধতি যার মূল ভিত্তি হচ্ছে, “সকলের তরে সকলে আমরা প্রত্যেকে মোরা পরের তরে”। একজনের বিপদে ও অসহায় অবস্থায় সবাই মিলে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার পদ্ধতি হচ্ছে তাকাফুল বা ইসলামী বীমা। ইসলামী বীমার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে নিজের ও অপরের কল্যাণ। কল্যাণময় এই পদ্ধতি ইসলামের কল্যাণময়ী জীবন পদ্ধতির সাথে অত্যন্ত সাযুজ্যপূর্ণ। ইসলামী চেতনা, মূল্যবোধ ও আদর্শের প্রতিফলন ঘটেছে এই পদ্ধতিতে। তাই মুসলিম অমুসলিম, ধনী-গরীব নির্বিশেষে সবার জন্য তা অতীব গুরুত্বপূর্ণ।
আমাদের সময় ডটকমকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে এ মন্তব্য করেন প্রাইম ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স লি:-এর সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বর্তমান প্রধান পরামর্শক কাজী মোরতুজা আলী।
তিনি বলেন, ইসলামী ব্যাংকিং ও ইসলামী ইন্স্যুরেন্স হচ্ছে ইসলামী শরীয়া মোতাবেক পরিচালিত আধুনিক ব্যাংক ও বীমা ব্যবস্থা। কুরআন, সুন্নাহ, ও ফিকাহ দ্বারা নির্দেশিত নীতিমালা অনুসারে ব্যাংকিং ও ইন্স্যুরেন্স ব্যবসা পরিচালনা করাই হচ্ছে উভয় সেক্টরের আদর্শগত মূল ভিত্তি। অনেকেই এই ধারণা করে থাকে যে ইসলামের নিজস্ব কোন অর্থনৈতিক পদ্ধতি নেই। এই ধারণাটি সঠিক নয়। ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের আর্থিক ব্যবস্থাপনা কি হবে তা ইসলামী শরীয়ায় সুষ্পষ্টভাবে বর্ণিত আছে। যেমন সুদ ভিত্তিক আর্থিক লেনদেন ইসলাম অনুমোদন করে না। আর্থিক লেন-দেনে অসচ্ছতা ও জুয়ার সংমিশ্রন ঘটলে আর্থিক লেন-দেন বৈধ হয় না। আয় ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে হালাল ও হারাম এর বিধান অবশ্যই মেনে চলা জরুরী। এই কারণে কুরআন, সুন্নাহ ও ফিকাহ শাস্ত্রে যে সব বিষয়কে বৈধতা দেয়নি তার কোনটিই ব্যাংক ও বীমা ব্যবস্থায় বহাল থাকলে তাকে ইসলামী ব্যাংক বা ইসলামী বীমা বলা যায় না। ইসলামী বীমা ব্যবস্থায় আর্থিক লেনদেন বা বিনিয়োগ করা হয় শারীয়াহ অনুমোদিত পথ ও পদ্ধতিতে। এসব পদ্ধতি হচ্ছে মুশারাকা, মুদারাবা, বাই মুয়াজ্জল, ইসতিসনা, সালাম, জুয়ালা ইত্যাদি। এগুলি নেহায়েত কোন শব্দ নয় এগুলি এক একটি পদ্ধতির নাম।
কাজী মোরতুজা আলী আরো বলেন, ইসলামী ইন্স্যুরেন্স এর গুরুত্ব খুব অল্প কথায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। কারণ ইসলামের গুরুত্ব ও বীমার গুরুত্ব উপলব্ধি করা সম্ভব না হলে ইসলামী বীমার গুরুত্ব উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবন পদ্ধতি এ কথা যারা স্বীকার করেন, তাদের পক্ষে এটি বোঝা সহজ যে ব্যাংক ও বীমা ব্যবস্থায় ইসলামী নীতিমালা তথা শরীয়ার বিধি বিধান প্রয়োগ করা জরুরী। শরীয়াহ অনুমোদন করে না এমন কোন বিষয় যদি ব্যাংক ও বীমা ব্যবস্থায় থাকে তবে তা ইসলামী হতে পারে না। ইসলামের উৎস “কুরআন” মহান আল্লাহর বাণী ও দিক-নির্দেশিকা। কুরআনের বিধানসমূহ এবং মহানবীর (সা.) জীবনাচরণ আদেশ অনুসরণ করা মুসলিমদের জন্য অবশ্য পালনীয়। কারণ তারা বিশ্বাস করেন যে মহান আল্লাহর বিধান ও মহানবী (সা.) এর সুন্নাহ মানুষের জন্য সবচাইতে কল্যাণকর। মহান সৃষ্টিকর্তা আমাদের জন্য যে সব বিধান দিয়েছেন তা সমগ্র মানবতার জন্য কল্যাণকর বলেই তা অনুসরণ করা অত্যন্ত জরুরী। মানুষের ইহকালীন ও পরকালীন মুক্তি ও শান্তির জন্য ইসলামের বিকল্প নেই। অতএব, ইসলাম আমাদের জন্য সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ তা অস্বীকার করা যায় না। বীমা ব্যবস্থাকে আমাদের বিচার করতে হবে যে তা মানুষের জন্য কল্যাণকর কি না। ব্যাংক এবং বীমা, সঞ্চয় ও আর্থিক নিরাপত্তা প্রদানের একটি পদ্ধতি। কিন্তু ইসলামের কল্যাণময়ী বিধানের পরিপূর্ণ প্রতিফলন এখানে ঘটেনি। তাই, গারার, রীবা ও মাইসির (অস্পষ্টতা, সুদ ও জুয়া) মুক্ত ব্যাংক ও বীমা চালু করা প্রয়োজন।
ইসলামী বীমা মূলত এক ধরনের সমবায়ী পদ্ধতি যার মূল ভিত্তি হচ্ছে “সকলের তরে সকলে আমরা প্রত্যেকে মোরা পরের তরে”। একজনের বিপদে ও অসহায় অবস্থায় সবাই মিলে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার পদ্ধতি হচ্ছে তাকাফুল বা ইসলামী বীমা। ইসলামী বীমার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে নিজের ও অপরের কল্যাণ। কল্যাণময় এই পদ্ধতি ইসলামের কল্যাণময় জীবন পদ্ধতির সাথে অত্যন্ত সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং কোনক্রমেই তা সাংঘর্ষিক নয়। ইসলামী চেতনা, মূল্যবোধ ও আদর্শের প্রতিফলন ঘটেছে এই পদ্ধতিতে তাই মুসলিম অমুসলিম, ধনী-গরীব নির্বিশেষে সবার জন্য তা অতীব গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্বে ইসলামী ইন্স্যুরেন্সের ক্ষেত্রে কোন দেশগুলো ভালো করছে? এমন প্রশ্নের উত্তরে কাজী মোরতুজা আলী বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তাকাফুল বা ইসলামী বীমার উদ্ভব, বিকাশ ও বিস্তৃতি একেকভাবে ঘটেছে। যেমন ধরা যাক সুদানে প্রথম পূর্ণাঙ্গ ইসলামী বীমা জন্ম লাভ করে ১৯৭৯ সালে। বর্তমানে বিশ্ব তাকাফুল বাজারে সুদানের অবস্থান ২% এর কম। মিশরের অবদান বর্তমানে ১% এর কাছাকাছি। আফ্রিকায় অন্যান্য যেসব দেশে তাকাফুল বা ইসলামী বীমা চালু হয়েছে এবং ধীরে ধীরে বিস্তার লাভ করছে সেগুলো হচ্ছে আলজেরিয়া, নাইজেরিয়া, লিবিয়া, মৌরিতানিয়া, কেনিয়া, সেনেগাল ইত্যাদি।
বাংলাদেশে তাকাফুলের বয়স প্রায় ১৬ বছর। বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের অবদান ১% এর কিছু বেশি হতে পারে। একক দেশ হিসেবে ইসলামী বীমায় সর্বোচ্চ অবদান ইরানের যা ৪০% এর বেশি। ইরানে সকল আর্থিক লেনদেন সুদমুক্ত এবং সেই হিসেবে সুদমুক্ত ইসলামী বীমা ব্যবস্থা চালু রয়েছে, তবে সেখানে তাকাফুল পদ্ধতি চালু নেই। দূর প্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে মালয়েশিয়া সর্বোচ্চ অবস্থানে রয়েছে। বিশ্ব তাকাফুলে মালয়েশিয়ার অবদান (+১০%)। এর পরে রয়েছে ইন্দোনেশিয়া ৪%। অমুসলিম দেশ যেমন ঃ সিংগাপুর, থাইল্যান্ড এবং শ্রীলংকায় তাকাফুল ব্যবস্থা চালু হয়েছে এবং সফলতার সাথে বাজার সম্প্রসারণ ঘটেছে। মধ্যপ্রাচ্যের জি.সি.সিভুক্ত ছয়টি দেশের মধ্যে তাকাফুল বিশ্ব বাজারে সর্বোচ্চ অবদান সউদি আরবের যা প্রায় ৩০%। এর পরের অবস্থান সংযুক্ত আরব আমিরাতের যা বিশ্ব তাকাফুলের প্রায় ৬%। এই অঞ্চলের অন্যান্য উল্লেখযোগ্য দেশ হেচ্ছ কুয়েত, কাতার এবং বাহরাইন। মুসলিমপ্রধান দেশ ইউরোপের তুরস্কে তাকাফুল ক্রমান্বয়ে যথেষ্ট বিকাশ লাভ করেছে এবং তাকাফুলের সম্ভাবনাময় বাজার হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
একটি ব্যবসায় মৌলিকভাবে কী কী কারণ যুক্ত হলে সেটা হারাম হবে এবং কোন কোন বিষয়গুলো মুক্ত থাকলে সেটা হালাল হবে? এমন প্রশ্নের উত্তরে কাজী মোরতুজা আলী বলেন, এক কথায় বলতে গেলে বলা যায় যে, ব্যবসার ক্ষেত্রে নিষিদ্ধ বা হারাম বিষয়গুলো যুক্ত থাকলে তা অবৈধ বা ইসলামের দৃষ্টিতে গ্রহণ যোগ্য হবে না। মহাগ্রন্থ আল কুরআনে নিষিদ্ধ বিষয়গুলো খুব স্পষ্টভাবে বর্ণিত রয়েছে। যেমন সুদ, ঘুষ, প্রতারণা, জুয়া, মদ, শুকর, তাজা রক্ত ইত্যাদি। ব্যবসার ক্ষেত্রে এসব বিষয়গুলো সম্পৃক্ত থাকলে ইসলামের দৃষ্টিতে তা হবে অবৈধ। সম্পদ অর্জনের সবচেয়ে উত্তম এবং সর্বাধিক মর্যাদাপূর্ণ মাধ্যম হলো বৈধ ব্যবসা। একজন ব্যবসায়ী এই মর্যাদা তখনই পাবেন যখন তিনি সকল হারাম দ্রব্য এবং হারাম পদ্ধতি বর্জন করবেন এবং ব্যবসার সকল শিষ্টাচার ও নৈতিক মানদÐের আলোকে তা পরিচালনা করবেন।
ইসলামের দৃষ্টিতে ব্যবসার ক্ষেত্রে বর্জনীয় হচ্ছে
ক.প্রতারণা, ঠকবাজী, ধোকা দেওয়া ও মিথ্যা শপথ করা। খ. মূল্যবৃদ্ধির উদ্দেশ্যে পণ্য মজুদ করা। গ. কুরআন, সুন্নাহ শরীয়া অনুসরণে ফকীহগণ যে সব বিষয়কে বর্জনীয় বলেছেন তা বর্জন করা।
শরীয়ার দৃষ্টিকোণ থেকে হালাল বা বৈধ ব্যবসার জন্য যা পালণীয় তা হচ্ছে
ক.ব্যবসার ক্ষেত্রে শরীয়া শিষ্টাচার ও নৈতিকতা পালন। খ. ব্যবসার ক্ষেত্রে সততা, সত্যবদিতা ও আমানতদারীতা অবলম্বন। গ. ব্যবসায়ী পন্যের উপর শরীয়ার বিধান অনুযায়ী যাকাত প্রদান। ঘ. সকল প্রকার লেনদেনে ও ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ।
মহান আল্লাহর প্রতি পরিপূর্ণ বিশ্বাস রেখে উত্তম আমল বা পুন্যের কাজ হিসেবে যারা ব্যবসা পরিচালনা করবেন তারাই ইহকালীন ও পরকালীন জীবনে মুক্তি পাবেন। তাহলেই সমাজ হবে আরো সুন্দর, আরো কল্যাণময়।