শনিবার, ১০ নভেম্বর, ২০১৮ ইং ২৬ কার্তিক, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ,১ রবিউল-আউয়াল, ১৪৪০ হিজরী

অ্যা ব্রোকেন ড্রিম বিকজ, ট্রুথ ইজ নো ডিফেন্স!

AmaderIslam.COM
সেপ্টেম্বর ২৩, ২০১৮
news-image

রশীদ জামীল : কিছু ব্যাপার সময়ের হাতেই ছেড়ে দিতে হয়। সিনহা সাহেবের কেইসটাও সেই ক্যাটাগরির। তিনি এখন তাঁকে বিতাড়নের গল্প লিখছেন, তাড়নার কথা ভুলে গিয়ে। অবহেলার কাহিনি বলছেন, আপ্যায়নের অধ্যায় চেপে গিয়ে। আওয়ামীলীগ সরকার তাঁকে কীভাবে অপদস্থ করে দেশছাড়া করেছে_সেটা বলেছেন, কিন্তু কত মন দুধ আর কত হাজার কলা খাইয়েছে, সেগুলো আর বলছেন না।

বিচারকের আসনে বসে অবিচারিক কাজ করলে ফলাফল কখনও ভালো হয় না। সুতরাং, শেষকথাটি যদি আগেই বলে ফেলার রেওয়াজ থাকে, তাহলে এভাবেও বলা যায়, তিনি আর কখনও চ্ছুত হতে পারবেন না। অচ্ছুতই থেকে যেতে হবে।

আওয়ামীলীগ তাকে ছুড়ে ফেলেছে। কখনও যদি বিএনপি ক্ষমতায় যায়, তাতেও তাঁর কপালে ভালো কিছু ছিড়ে পড়ার চান্স নাই। যতই বিএনপি তাঁকে প্রেসিডেন্ট বানানোর কথা বলুক, কোনোদিনই তারা এটা করবে না। চাইলেও পারবে না। বিএনপির সাথে জামাত আছে। আর জামাত এত জলদি তাদের নেতাদের ঝুলানোর কথা ভুলে গেছে_ ভাবলে তো ভুল হবে।

দুই.
বিচারপতি এস কে সিনহা তাঁর বই’র নাম রেখেছেন,
A BROKEN DREAM
Status of Rule of Law, Human Rights and Democracy
বাংলা করলে; ‘একটি স্বপ্নভঙ্গ। আইনের শাসনের অবস্থা, মানবাধিকার এবং গণতন্ত্র’।

ব্রুকেন ড্রিম না বলে ব্রুকেন ডিমও বলা যায়। স্বপ্ন তো ভাঙেনি। ভেঙেছে ডিম। নিজের ডিম অন্যেকে দিয়ে তা দেয়ালে সেই ডিম ঠিকমত গরম হয় না। এমন ডিম থেকে বাচ্চা ফুটার সম্ভাবনাও থাকে না। একজন বিচারকের আচরণ যদি হয় সরকারের আজ্ঞাবহ দাসের মতো, একজন বিচারক যদি নির্বাহী আদেশের গোলামী করে যান, দিনের পর দিন, তাহলে তাঁর কপালে দুর্গতি ছাড়া আর কী থাকতে পারে। যতদিন আওয়ামীলীগের আজ্ঞাবহ ছিলেন, যতদিন ‘জ্বি হুজুর’ টাইপ বিচার করেছেন, ততদিন আওয়ামীলীগ তাকে কদর করেছে। কিন্তু নুন খাবেন আর গুণ গাবেন না, কী করে হয়! ফলে যা হবার, তাই হয়েছে। কেঁদে আর লাভ আছে কোনো?

তিন.
বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। সেকেন্ড ডিভিশনে এলএলবি পাশ একজন উকিল ছিলেন। কথাটি তিনি নিজেই জানিয়েছেন তার বইয়ে। বইটির Chapter 2, Struggle for Survival বা বেঁচে থাকার যুদ্ধ অধ্যায়ে বলেছেন, I passed LL.B. in the second class securing the highest mark. My father completely disowned me and said that I should not give my identity as his son if I entered the law profession. আমি হাইয়েস্ট নাম্বারে সেকেন্ড ক্লাস এলএলবি পাস করার পর আমার বাবা আমাকে পুরোপুরিই ত্যাগ করলেন এবং বললেন, আইন পেশায় আমি যেনো কোথাও তাঁর (সন্তান হিশেবে) পরিচয় না দিই।

উকালতি শুরু করবার পর চরম অর্থকষ্টে চলছিল তার দিন। তিনি লিখেছেন, After the exam I enrolled as an advocate, but my luck did not favor me. I was facing acute financial crisis. I did not have my father’s financial support and my senior was not giving me adequate money.
পরীক্ষার পর আমি এডভোকেট হিশেবে নথিভুক্ত হলাম, কিন্তু ভাগ্য আমাকে ফেভার করছিল না। আমি সত্যিই আর্থিক সমস্যায় ভুগছিলাম। বাবা থেকে আর্থিক সাপোর্ট ছিল না, এবং সিনিয়রও আমাকে পর্যাপ্ত টাকা দিচ্ছিলেন না…

এভাবেই সিনহা সাহেবের আইনী ক্যারিয়ার শুরু। সেখান থেকে যাত্রা শুরু করে প্রধান বিচারপতি হয়ে মান সম্মান অপমান সবকিছু অর্জন করে এখন আমেরিকার নিউজার্সীতে নিজের কেনা বাড়িতে বসে স্বপ্ন ভাঙার গল্প লিখছেন।

চার.
বিচারপতি সিনহার আজকের এই অবস্থার জন্য দায়ী তিনি নিজেই। তিনি তার বইয়ের ভূমিকা যে লাইনটি দিয়ে শুরু করেছেন, এই একটি মাত্র লাইনকে যদি আমলে নিতেন, তাহলে আজ তার এই অবস্থা নাও হতে পারতো। তিনি তার বইটি শুরুতেই বলেছেন, OF the organs of the State, judiciary is an essential and integral part… বিচার বিভাগ হচ্ছে রাষ্ট্রের অঙ্গগুলির মধ্যে একটি অপরিহার্য এবং অবিচ্ছেদ্য অংশ…।

অর্থাৎ, রাষ্ট্রের অপরিহার্য এবং প্রধান অংশের নাম বিচার বিভাগ। এইন অর্থে বিচার বিভাগকে একটি রাষ্ট্রের মাথা বলা যায়। সেই মাথা যদি কারো কাছে ইজারা দিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে রাষ্ট্রের মেরুদণ্ডই ভেঙে পড়ে। আর বাংলাদেশে সেটিই হচ্ছিলো সিনহা বাবুদের নেতৃত্বে।

যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে দেশবাসী কিউরিয়াস ছিল। সামান্যতম দেশপ্রেম থাকা একজন মানুষও বিচারের বিরুদ্ধে ছিল না। সবাই চেয়েছে জাতি কলংকমুক্ত হোক। তাহলে এতো কাহিনি করার তো দরকার ছিল না। বিচার তার আপন গতিতেই আগাতে পারতো। সেই বিচারটি নিয়ে তিনি যে কাণ্ড ঘটালেন, হাজার বার গঙ্গাস্নান করেও তিনি কি তার শরীর থেকে সেই কলংক মুছে ফেলতে পারবেন?

পাঁচ.
শ্রী সুরেন্দ্র কুমার সিনহা তার বইয়ের ১০ম অধ্যায়টা এঁকেছেন প্রধান বিচারপতি হওয়া নিয়ে। শিরোনাম দিয়েছেন; Appointment as Chief Justice of Bangladesh। ৯ম অধ্যায়টা সাজিয়েছেন যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রসঙ্গে। যার শিরোনাম হচ্ছে, Role in the formation of ICT. আমি এখনো তাঁর বিশাল বই পুরোটা পড়িনি। ভূমিকা এবং ৯ম ও ১০ম চ্যাপ্টারটি পড়া হয়েছে মাত্র। আর শেষদিকের কয়েক পৃষ্ঠা। ৯ম অধ্যায় নিয়ে একটু কৌতূহল ছিল আমার। দেখতে চেয়েছিলাম সততার প্রশ্নে প্রশ্নবিদ্ধ একজন বিচারপতি লেখক হিশেবে বস্তুনিষ্টতার প্রশ্নে কতখানি পারফেক্ট হন।

আমার আগ্রহ ছিল সেই ঐতিহাসিক স্কাইপ কেলেংকারি নিয়ে উনার জবানবন্দিটা কেমন হয়, দেখা। কিন্তু ব্যাপারটি প্রায় চেপেই গেলেন তিনি। ট্রাইব্যুনাল বিচারপতি নাসিমের ফাঁস করা সেই স্কাইপ কেলেংকারীর কথা মানুষ এতো জলদি ভুলেগেছে; এটা তিনি কেমন করে ভাবলেন, আমি জানি না। সেদিন তাকে কীসের ভিত্তিতে অ্যাপিলেট ডিভিশনে নিয়ে যাওয়ার অফার দেওয়া হয়েছিল, সেই রেকর্ড কিন্তু আজও অনেকের কানে বাজে।

ছয়.
বিচারপতি সিনহা তার বইয়ে আওয়ামীলীগ কীভাবে তাকে অপমান করে তাড়িয়ে দিয়েছে, সেই কাহিনি লিখেছেন। আমরা বলব না তিনি মিথ্যা বলেছেন। কিন্তু তাঁর কি মনে আছে একদা তিনি মাহমুদুর রহমানের বিচার প্রসঙ্গে আদালতেই বলেছিলেন, ট্রুথ ইজ নো ডিফেন্স। কথাটি এখন যে তাঁর নিজের জন্যই এবং ভালোভাবেই প্রযোজ্য, ব্যাপারটি কি একটু বুঝতে পারছেন? তিনি যদি ভাবেন, একটি ব্রুকেন ড্রিম লিখে সকল পাপ মোচন করে ফেলবেন, তাহলে তো হল না।

বইটি এখনও পুরোটা পড়া হয়নি। ভূমিকা, যুদ্ধাপরাধের বিচার এবং তাকে দেশ থেকে তাড়ানোর চ্যাপ্টারটি শুধু পড়া হয়েছে। আর তাতেই মোটামুটি যেটুকু আন্দাজ করা গেছে, তা হলো, আত্মজীবনি স্টাইলে লেখা বইটিতে ধান ভাবারচে শীবের গীতই তিনি বেশি গেয়েছেন। গ্রাম বাংলায় একটি কথা আছে, কয়েক হাজার ইঁদুর মেরে বেড়াল তীর্থ যাত্রা করেছিল। একটি ব্রোকেন ড্রিম লিখে ফেলেই কি সাধু সাজা যায়?