শনিবার, ১০ নভেম্বর, ২০১৮ ইং ২৬ কার্তিক, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ,৩০ সফর, ১৪৪০ হিজরী

খাশোগি বিবাদ ও মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সমীকরণ

AmaderIslam.COM
অক্টোবর ১৮, ২০১৮
news-image
ড. আবদুল লতিফ মাসুম : বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে উত্তপ্ত অঞ্চল হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য। বিস্ময়ের ব্যাপার এই যে, ইতিহাসের অধিকাংশ সময়ে মধ্যপ্রাচ্য অস্থিরতা, অরাজকতা এবং যুদ্ধবিগ্রহে ব্যস্ত ছিল। বিশেষ করে ১৯৪৮ সালে আরব ভূমিতে জোরপূর্বক ইসরাইলের প্রতিষ্ঠার পর একদিনের জন্যও মধ্যপ্রাচ্য শান্ত ছিল না। বিগত ৭০ বছর ধরে ইসরাইলি আগ্রাসনে বিধ্বস্ত হচ্ছে ফিলিস্তিনি জনগণ। ফিলিস্তিনি জনগণের সংগ্রাম ও আত্মনিয়ন্ত্রণের আন্দোলন বিস্তৃত হয়েছে প্রতিবেশী দেশগুলোতে। সে কারণে ইসরাইলি আগ্রাসন সম্প্রসারিত হয়েছে সীমান্ত অতিক্রম করে ঐসব দেশে। মরক্কো থেকে চীনের পশ্চিম সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত কথিত মধ্যপ্রাচ্যে রাজা-বাদশা, আমীর-ওমরাহ্ এবং নামি-বেনামি স্বৈরাচারের রাজত্বে ঠাসা। কিন্তু গণতন্ত্রের জন্য সাধারণ জনগণের আকাঙ্ক্ষাও তীব্রতর। তাই দেখা যায় ২০১১ সালে তিউনিসিয়ায় যখন আরব বসন্তের সূচনা, তা বিস্তৃত হয়েছে সর্বত্র।
সেই আরব বসন্তের আগমনে সিরিয়াও হয়েছিল আন্দোলিত। অন্যত্র আন্দোলনের অসফল সমাপ্তি ঘটলেও সিরিয়ায় তা ঘটেনি। সেখানে বিগত সাত বছর ধরে চলছে গৃহযুদ্ধ। মধ্যপ্রাচ্যের সাধারণ বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী প্রতিবেশীরা সংশ্লিষ্ট হয়েছে তাদের হিসাব-নিকাশ অনুযায়ী। সে হিসাব অনেক জটিল ও কুটিল। তাদের ঐ জটিলতা ও কুটিলতার সুযোগ নিয়েছে পৃথিবীর মোড়লেরা। সেখানে স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার পরস্পর বিপরীত দাবি থেকে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, গ্রেট ব্রিটেন, ফ্রান্স এবং অবশেষে রাশিয়ান ফেডারেশন। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এসব দেশের সঙ্গে সম্পর্কের নিরিখে তাদের ভূমিকা নির্ণয় করছে। কখনো কখনো দ্বি-পাক্ষিক, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সহজ সমীকরণ দ্বারা সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা বোঝা সহজ নয়। সিরিয়াকে নিয়ে বর্তমান সমীকরণ সে রকম একটি কঠিন অবস্থানের ইঙ্গিত দিচ্ছে। সেখানে নিত্য দিন ঘটনার নতুন মোড় নিচ্ছে।
সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে মার্কিন পক্ষপুষ্ট বাহিনী যখন বিজয়ের প্রান্ত সীমায় উপনীত, তখন রাশিয়া তার মিত্র বাসার আল আসাদ সরকারকে রক্ষার জন্য এগিয়ে আসে। পাল্টে যায় সমর চিত্র। শুধু পাঁচ ভাগ ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ করছিল আসাদ সরকার, এখন তারা ৭০ ভাগ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে। ইরান রুশ-সমর্থিত অগ্রগতির সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। ইরান যেখানে আছে তার বিপরীতে ইসরাইলকে থাকতেই হবে। তুরস্ক ইরানের পক্ষে। কিন্তু আসাদ সরকারের পক্ষে নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলি আক্রমণকে সমর্থন দিচ্ছে। রাশিয়া ইসরাইলি আক্রমণ অনুমোদন করছে না। অথচ প্রতিহতও করছে না। গত মাসের শেষের দিকে তুরস্কের সীমান্তের কাছাকাছি সিরিয়ার উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলের ইদলিব প্রদেশ নিয়ে এক জটিল সমস্যার উদ্ভব হয়। আসাদ বাহিনী যখন ইদলিব দখল করার চেষ্টা করে, তখন তুরস্ক নিজ স্বার্থে ইদলিবের ওপর নিজ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে। অপরদিকে রাশিয়া ও ইরান ইদলিবে আসাদ বাহিনীর প্রবেশ চায়। রাশিয়ার সঙ্গে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেফ তায়েফ এরদোয়ান নতুন করে সম্পর্ক করার নিরিখে ইদলিবে ভিন্নতর ভূমিকা আশা করেন। অপরদিকে ইরানের সঙ্গে চমত্কার সম্পর্কের কারণে ইদলিবে তুরস্কের স্বার্থের প্রতি ইরানের সমর্থন আশা করে তুরস্ক। বিষয়টি নিয়ে তিন নেতা গত সাত সেপ্টেম্বর তেহরানে এক শীর্ষ বৈঠকে মিলিত হন। তারা ইদলিব সমস্যা সামরিক সমাধানের পরিবর্তে একটি কূটনৈতিক সমাধানে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন।
শীর্ষ বৈঠকের পূর্বে এই তিন নেতা পৃথক পৃথক ভাবে একে অপরের মতামত জানার চেষ্টা করেন। ইরানি প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি সিরিয়া থেকে মার্কিন বাহিনীর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার দাবি করেন। তিনি সিরীয় জনগণের দ্বারা তাদের নিজস্ব সমস্যা সমাধানের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। রুশ নেতা ভ্লাদিমির পুতিন একই ভাষায় কথা বলেন। তিনি বলেন, সকল পক্ষের সম্মতির ভিত্তিতে একটি রাজনৈতিক সমাধানই কাম্য। তিনি জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে একটি সাংবিধানিক কমিটি গঠনের প্রস্তাব করেন। প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান সিরিয়া— বিশেষত ইদলিবে একটি যৌক্তিক সমাধানে পৌঁছার উপায় বের করার আবেদন জানান। তিনি বলেন, ‘শুধু সিরিয়ার ভবিষ্যত্ নয়, ইদলিবে জড়িয়ে আছে গোটা অঞ্চলের শান্তি প্রক্রিয়া। ইদলিবে যেকোনো আক্রমণ মানবিক দুর্যোগ সৃষ্টি করবে।’ এই শীর্ষ সম্মেলন যদি ইদলিবে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করতে পারে, তাই হবে তাদের জন্য বিরাট বিজয়। এরদোয়ান হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন যে, তুরস্ক আসাদ বাহিনীর অনুগ্রহের ওপর ইদলিবের ভবিষ্যত্ ছেড়ে দেবে না। তিনি সেখানে মার্কিন ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করেন। তবে শীর্ষ সম্মেলনের আগে রুশ বোমারু বিমান ইদলিবের ওপর হামলা চালিয়েছে। শীর্ষ সম্মেলনের পরে শান্তি প্রক্রিয়ার পথে অসম্ভব কিছু অর্জিত না হলেও সেখানে একটি অঘোষিত স্থিতি অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। উল্লেখ্য যে আসাদবিরোধী পক্ষ এখন ইদলিবে জমায়েত হয়েছে। সেখানে রয়েছে সমগ্র সিরিয়া থেকে আশ্রয় নেওয়া উদ্বাস্তু জনগণ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সেখানে আক্রমণের বিরোধী। কিন্তু সেখানে জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত সত্ত্বেও মার্কিনিরা শান্তি স্থাপনে অক্ষম।
রাশিয়া-ইরান-তুরস্কের সূচিত সমীকরণের বাইরে একটি নতুন ঘটনা নতুন সমস্যার সৃষ্টি করেছে। সেটা হচ্ছে তুর্কি বংশোদ্ভূত সৌদি সাংবাদিক জামাল খাশোগির অন্তর্ধান। সৌদি বর্তমান ক্ষমতাসীন যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান বিরোধী এই সাংবাদিক স্বদেশে কোপানলে পড়লে কৌশলে আমেরিকা পালিয়ে যান। খাশোগি গত ২ অক্টোবর প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের জন্য ইস্তাম্বুলে অবস্থিত সৌদি কনস্যুলেটে প্রবেশ করেন। এ সময়ে কনস্যুলেটের বাইরে তার তুর্কি বাগদত্তা হাতিশ চেঙ্গিশ অপেক্ষা করছিলেন। কিন্তু খাশোগি আর বেরিয়ে আসেননি। তুরস্ক সরকার ও খাশোগির বাগদত্তার দাবি, তাকে কনস্যুলেট ভবনের  ভেতরে হত্যা করা হয়েছে। পরে কূটনৈতিক গাড়িতে লাশ সরিয়ে ফেলা হয়েছে। তুরস্ক সরকার ঐ সময়ে সৌদি ঘাতকদের আগমন সম্পর্কেও তথ্য দিচ্ছে। সৌদি সরকার ঐ অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে বলেছে, কিছুক্ষণ পরই খাশোগি কনস্যুলেট থেকে বেরিয়ে যান। খাশোগির সম্ভাব্য হত্যা নিয়ে তুরস্ক-যুক্তরাষ্ট্র বনাম সৌদি আরব বাকবিতণ্ডা জমে উঠেছে। ইস্তাম্বুল কনস্যুলেটে প্রবেশের পর খাশোগি কীভাবে নিখোঁজ হলেন তার ব্যাখ্যা দেওয়ার জন্য সৌদি আরবের ওপর প্রবল চাপ বাড়িয়েছে তুরস্ক ও যুক্তরাষ্ট্র। এই নির্মম ঘটনায় একদল কংগ্রেস সদস্য সৌদি আরবের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়েছে। তারা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সৌদি আরবের সামরিক সম্পর্ক ঝুঁকিতে পড়বে। শুরুতে ট্রাম্প শক্ত ভাষায় খাশোগির বিষয়ে নিন্দা করেছেন। এর উত্তরে সৌদি যুবরাজ বলেছেন, কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিলে তারাও পাল্টা ব্যবস্থা নেবে। গতানুতিক সৌদি-মার্কিন উষ্ণ সম্পর্কে খাশোগির বিষয়টি শীতলতার কারণ ঘটিয়েছে। অপরদিকে এই বিষয়ে তুরস্ক ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভিন্ন অবস্থান তুর্কি-মার্কিন সম্পর্কের শীতলতায় কিছুটা উষ্ণতা দিয়েছে। আলোচ্য রুশ-ইরান ও তুরস্কের শীর্ষ বৈঠক তথা নতুন সমীকরণ খাশোগির বিষয়ে কোনো জোরালো প্রভাব ফেলবে না বটে, তবে তা সমসাময়িক জনমতকে প্রভাবিত করবে নিঃসন্দেহে।
মধ্যপ্রাচ্যের এই সময়ের প্রধান সমীকরণ হচ্ছে দুটো— প্রথমত, ইরানি ভয়ে কম্পমান সৌদি আরব এবং তার মিত্রদের সমীকরণ। অপর সমীকরণটি হচ্ছে ইসরাইল-মার্কিন মিত্রতা। ফিলিস্তিনের মৌলিক মানবিক ও অনতিক্রম্য সমস্যা সত্ত্বেও সাম্প্রতিক সৌদি-ইসরাইল সম্পর্ক অনেকটা অচিন্তনীয়। সৌদি যুবরাজের গদির চিন্তা এতটাই প্রবল যে তাদের কাছে ফিলিস্তিনি জনগণের প্রতি দায়বোধ কোনো বিষয়ই নয়। ট্রাম্প নির্দেশিত একক রাষ্ট্র ও জেরুজালেমে ইসরাইলের রাজধানী স্থানান্তরকে প্রকারান্তরে সৌদিরা সমর্থন করছে। ইসরাইলের বিরুদ্ধে সংগ্রামশীল হিজবুল্লাহ ও ব্রাদারহুডের প্রতি মহাক্ষিপ্ত সৌদি যুবরাজ। তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য ইরান বধ। ১৫ মাস আগে কাতারের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক অবরোধ আরোপ করেছে সৌদিজোট। অপরাধ ইরানের প্রতি সহায়তা। কাতারের সঙ্গে রয়েছে তুরস্ক। ইরান যুদ্ধরত সিরিয়া, বিধ্বস্ত ইরাক ও ইয়েমেনে নিজ প্রভাব-প্রতিপত্তি বাড়িয়ে চলেছে। এর মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছে সৌদি মার্কিন মিত্রজোট। এ অবস্থায় ইরান মার্কিন হুমকির বিপরীতে পরাশক্তি রাশিয়ার নৈকট্য অর্জন করে এগিয়ে যাবে—এটাই স্বাভাবিক। সুতরাং তুরস্ক, ইরান ও রুশ সমন্বয়ে একটি নতুন সমীকরণ এই অঞ্চলে উল্লেখযোগ্য ঘটনা। একজন মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ জেমস এম. ডরসি মনে করেন, সূচিত এই জোট চূড়ান্ত ও দীর্ঘস্থায়ীভাবে সিরিয়া তথা আঞ্চলিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তিনটি বিষয় তিনি বিবেচ্য বলে মনে করেন। প্রথমত রুশ-তুরস্ক ক্রমবর্ধমান সমঝোতা, দ্বিতীয়ত যুদ্ধ-বিধ্বস্ত সিরিয়ার পুনর্গঠনে ভূমিকা, তৃতীয়ত সৌদি জোটের অকার্যকারিতা। এছাড়া কমন এনিমি ইসরাইলের বিরুদ্ধে সাধারণ জনগণের ঐক্য একটি রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে। সুতরাং সার্বিক বিবেচনায় তিনটি রাষ্ট্রের ঐক্য একটি কার্যকর জোটের সূচনা করতে পারে। পুরাতন ও বর্তমান সকল সমীকরণকে অতিক্রম করে নতুন মৈত্রী সৃষ্টি করতে পারে নতুন ইতিহাস।
লেখক : অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়