শনিবার, ১০ নভেম্বর, ২০১৮ ইং ২৬ কার্তিক, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ,৩০ সফর, ১৪৪০ হিজরী

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে কী ভাবছেন আলেম সম্পাদকরা?

AmaderIslam.COM
অক্টোবর ১৮, ২০১৮
news-image

ওমর ফারুক : ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছে সম্পাদক পরিষদ। গত সোমবার আয়োজিত এ মানববন্ধন থেকে দশম জাতীয় সংসদের শেষ অধিবেশনেই আইন সংশোধনের দাবি জানানো হয়েছে৷

জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধনে একত্রিত হন ১৬টি দৈনিক পত্রিকার সম্পাদক৷ তারা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ৯টি ধারা (৮, ২১, ২৫, ২৮, ২৯, ৩১, ৩২, ৪৩ ও ৫৩) নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন। সম্পাদক পরিষদের দাবি, ‘এই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিপন্থী। এই আইন বলবৎ থাকলে প্রেস মিডিয়া, টেলিভিশন, অনলাইন মিডিয়া কেউ স্বাধীনভাবে আমাদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে পারবে না৷’

সম্পাদক পরিষদের ব্যানেরও লেখা ছিল, ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মত প্রকাশের স্বাধীনতাবর্জিত ধারাসমূহ বাতিল করো।’ তারা তথ্য অধিকার আইনকে ‘দ্ব্যর্থহীনভাবে’ ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ওপর প্রাধান্য দিতে হবে বলেও দাবি জানিয়েছেন।

সম্পাদক পরিষদের অধিকাংশ দাবির সঙ্গেই একমত পোষণ করেছেন দেশের ইসলামি ঘরানার সংবাদমাধ্যম ও অনলাইন নিউজ পোর্টালের সম্পাদকরা, রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়াও। আলেম সম্পাদকদের কেউ কেউ ইসলামে বাকস্বাধীনতার সীমারেখা রয়েছে দাবি করে এ আইনকে যুক্তিসঙ্গত ও উপযোগী মনে করলেও কেউ বলছেন এর মাধ্যমে সরকার নিজেকে নিরাপদ রাখার সুযোগ করে নিয়েছে। তবে অনুমতি ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠানের তথ্য চুরি বা কারও সম্মানহানিকর খবর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ করা যাবে না, এমন আইনকে তারা হাস্যকর বলেও মন্তব্য করেছেন। সরকার অপরিপক্ব ও সুচিন্তিত মতামত নিয়ে আইনটি করেনি বলেও তাদের দাবি।

আওয়ার ইসলাম টুয়োন্টিফোর ডটকমের সম্পাদক হুমায়ুন আইয়ুব ফাতেহ২৪ কে বলেন, ‘সাংবাদিকদের সংবাদপত্রে যাচ্ছেতাই লেখার দাবিটি যুক্তিসঙ্গত নয়। ইসলামও প্রচার স্বাধীনতায় ও বাস্বাধীনতায় সীমারেখা বেঁধে দিয়েছে। যাচ্ছেতাই লেখা ও স্বেচ্ছাচারিতার মধ্যে বাধা দেওয়া অবশ্যই সরকারের দায়িত্ব। সেটা ডিজিটাল আইনে এসেছে এবং এটাকে আমি সাধুবাদ জানাই।’

হুমায়ুন আইয়ুব মনে করেন, এর মাধ্যমে তথাকথিত বা নামধারী সাংবাদিকদের বিভ্রান্তিকর তথ্যপ্রচার ও তথ্য সন্ত্রাস প্রতিরোধ সম্ভব হবে। বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে কাউকে ক্ষতিগ্রস্থ করার যে অপব্যবহার শুরু হয়েছে, তারও লাগাম টেনে ধরা হবে ডিজিটাল আইনের মাধ্যমে।

কিন্তু এ আইনে পুলিশকে কোনো পরোয়ানা ছাড়াই যে গ্রেপ্তার বা তদন্তের অধিকার দেওয়া হয়েছে এটি কি কাউকে হয়রানির সুযোগ করে দিবে না? কিংবা প্রতিষ্ঠানের অনুমতি ছাড়াই তথ্য প্রকাশের বিধিনিষেধ সংবাদপত্রের স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ন করবে না?—এমন প্রশ্নে হুমায়ুন আইয়ুব বলেন, ‘হ্যাঁ, এর মাধ্যমে সংবাদপত্রের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতাকে হুমকিতে ফেলে দিতে পারে। তবে কাউকে তথ্যসন্ত্রাসের মাধ্যমে আঘাত করে ও ক্ষতিগ্রন্ত করে পরবর্তীতে শুধু ভুল সংশোধন বা ভুল স্বীকার করে পুষিয়ে দেওয়ার যে চেষ্টা করা হয়, তা যথাপোযুক্ত নয়। বরং যার ক্ষতি হওয়ার সে চরমভাবেই ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে যায়। এজন্য এমন একটি আইনের প্রয়োজনও ছিল।’

তবে এ আইনে পুলিশকে যে ক্ষমতা দেওয়ার হয়েছে এর অপব্যবহারের মাধ্যমে দেশে অরাজকতা ও অশান্তি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলেও মনে করছেন হুমায়ুন আইয়ুব। এ আইনটির ভারসাম্য রক্ষা করা প্রয়োজন বলেও তিনি মনে করছেন।

তবে কিছুটা ভিন্নমত পোষণ করেছেন বাঙ্গাল২৪ এর সম্পাদক নোমান বিন আরমান। তিনি বলেন, এ আইনের মাধ্যমে মূলত সরকার তার নিজের নিরাপত্তার বিষয়টি প্রাধান্য দিয়েছেন। এটি যে কেউ চায়। কেউ চায় না তার আভ্যন্তরীণ বিষয়ে অন্য কেউ নাক গলাক। অতএব কারও নিজের নিরাপত্তার প্রশ্নে অন্যের আঘাত বা সমস্যাটা তার কাছে বড় নয়।

সরকার তার কী ধরণের নিরাপত্তা বা সেফটির জন্য এ আইন করেছে বলে আপনি মনে করছেন?—এ বিষয়ে তিনি বলেন, যেমন অনুমতি ছাড়া সরকারি কর্মকর্তাদের দুর্নীতি কিংবা কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতির তথ্য প্রকাশ করা যাবে না। এগুলো আগে অবাধেই করা যেতো। এখন এসব আইনের মাধ্যমে এর বিধিনিষেধ টেনে দেওয়া হয়েছে। আমাদের আপত্তির জায়গাটা এখানেই। এছাড়া আদালতের পরোয়ানা ছাড়াই পুলিশেকে যে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, এটিও আপত্তিকর। কারণ আদালতের পরোয়ার মাধ্যমে কেউ গ্রেফতার হলে, আশা থাকে সে ন্যায় বিচার পেতে পারে। কিন্তু পরোয়ানা ছাড়াই গ্রেফতার হলে অনেক ক্ষেত্রেই যেটা হয় তা হলো, কোনো বাহিনীই স্বীকার করে না তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তখন ভিকটিমের খোঁজ না পাওয়া বা গুম হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ কারণেই এ আইনটি আপত্তিকর ও সম্পাদক পরিষদের দাবিগুলোর সঙ্গেও আমরাও একমত।

ডিজিটাল আইনের বেশ কয়েকটি ধারা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন ইনসাফ টুয়েন্টিফোর ডটকমের সম্পাদক সাইয়েদ মাহফুজ খন্দকার। তিনি বলেন, ধারা ২৮ এ ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের বিষয়ে যে শাস্তি দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, তা আমার মতে খুবই কম বলে মনে হয়েছে। আমি মনে করি এ বিষয়ে মৃত্যুদণ্ডের সাজা রাখা প্রয়োজন ছিল। কারণ বিষয়টি রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য হুমকি হয়ে দাড়ায়। অপরদিকে এ আইনটি আরও স্পষ্ট করারও প্রয়োজন ছিল। কী কী বিষয়ে মন্তব্য করলে, কার বিষয়ে মন্তব্য করলে, কোন বিষয়ে ভিডিও সম্প্রচার করলে বা কোন বিষয়ে ছবি আঁকলে কী ধরণের সাজা হবে এসবের বিশদ বর্ণনা থাকার প্রয়োজন ছিলো। এছাড়া বিষয়টি নিয়ে স্বতন্ত্রভাবেও কোনো আইন করা যেতো। মুসলিমদের জন্য এ ধারাটি বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়িছে। এখন একজন মুসলিম হিসেবে আমাদের মূর্তিপূজা ও দেব-দেবীর বিরুদ্ধে কথা বলাটা হুমকির মধ্যে পড়ে যাবে।

এছাড়া ধারা ২১ নিয়ে আপত্তি তুলেছেন মাহফুজ খন্দকার। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধ, জাতির পিতা বা জাতীয় সঙ্গীতকে অবমাননার যে সাজা রাখা হয়েছে তাও প্রশ্নবিদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশে বিভক্ত একটি বিষয়। একেকজন একেক চোখে দেখে। বামরা এক চোখে দেখে, ডানরা এক চোখে দেখে, এমনকি ইসলামপন্থীরা এক চোখে দেখে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কী, এটা তো আমরা এখনো স্থীর করতে পারিনি। বিএনপির দৃষ্টিকোণকে যদি আপনি অবমাননাকর বলেন, তাহলেও এটা রাষ্ট্রের দৃষ্টিতে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হয়ে যাবে। বিএনপির কেউ বলল, স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমান। এটি প্রচার করলে বা প্রকাশ করলে কি আমরা অপরাধী হয়ে যাবো? এ বিষয়গুলো আরও স্পষ্ট করা প্রয়োজন ছিল।

‘এছাড়াও সরকার, প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যক্তির সম্মানহানি হয়, এমন সংবাদ প্রচারে যে বিধি উল্লেখ করা হয়েছে তাও প্রশ্নবিদ্ধ। এখন সরকারের কোনো কর্মকর্তা বা মন্ত্রী দুর্নীতি করলে কি আমরা এটা প্রকাশ করতে পারবো না? এটা তো সরকারের সম্মানহানির মাঝে পড়ে। তাহলে তো দুর্নীতি আরও বেড়ে যাবে। সরকারের সম্মানহানির জন্য যদি কোনো দুর্নীতির সংবাদকে চাপা দিয়ে যেতে হয়, তখন আর সংবাদপত্রকে আর সংবাদপত্র বলা হবে না।’

‘আমি মনে করি, এটা জগাখিচুরি আইন। সরকার খুব সুচিন্তিত মত নিয়ে আইনটি করেছে বলে আমার মনে হয় না। আইনটি অপরিপক্ব একটি আইন। এটি নিয়ে সরকারের আরও ভাবা উচিত ছিল।’ সৌজন্যে : ফাতেহ24