শনিবার, ১০ নভেম্বর, ২০১৮ ইং ২৬ কার্তিক, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ,১ রবিউল-আউয়াল, ১৪৪০ হিজরী

ভোটের রাজনীতিতে কওমি স্বীকৃতির প্রভাব কতটা পড়বে?

AmaderIslam.COM
অক্টোবর ১৮, ২০১৮
news-image

আতাউর রহমান খসরু : ইতিমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে কওমি মাদরাসার শিক্ষা সনদের স্বীকৃতি প্রদানের সকল আইনি প্রক্রিয়া। দ্রুততম সময়ে এই আইনী প্রক্রিয়া সম্পন্ন করায় কওমি ধারার আলেম-উলামা ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেছে সরকারের প্রতি। বিশেষত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আন্তরিকতার প্রসংশা করেছেন আলেমদের অনেকেই।

বিপরীতে কওমি মাদরাসার স্বীকৃতি প্রদানের ঘটনাকে রাজনীতিকরণের চেষ্টাও দেখা গেছে অনেকের মধ্যে। তারা বলছেন, আন্তরিকতা নয়, ভোটের রাজনীতির অংশ হিসেবেই স্বীকৃতি দিয়েছে সরকার। স্বীকৃতি বিষয়ে কওমি ধারার নগ্ন সমালোচনা করতে দেখা গেছে একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের সদস্যদের। তারা বলছে, স্বীকৃতি নিয়ে কওমি আলেমরা সরকারের ফাঁদে পা দিয়েছে।

সম্মিলিত শিক্ষাবোর্ড আল-হাইয়াতুল উলয়া লিল-জামিয়াতিল কওমিয়া-এর চেয়ারম্যান আল্লামা আহমদ শফীরও সমালোচনা করছে একটি চিহ্নিত মহল। আল্লামা আহমদ শফী একাধিকবার এসব সমালোচনার জবাব দিয়েছেন। তবে সাথে সাথে তিনি সতর্ক করেছেন ‘ভেতর ও বাইরে’ কেউ যেন কওমি স্বীকৃতির প্রভাবকে অন্যায়ভাবে কাজে লাগাতে না পারে।

তার এ বক্তব্য ভোটের রাজনীতিতে কওমি শিক্ষা সনদের স্বীকৃতির প্রভাবকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, কওমি মাদরাসার শিক্ষা সনদের স্বীকৃতির কারণে আওয়ামী লীগের সঙ্গে কওমি ধারার বৈরী ভাব কমে এলেও ভোটের রাজনীতিতে তার খুব বেশি প্রভাব পড়বে না। আর আওয়ামী লীগ সরকারও তা খুব বড় করে প্রচার করবে না। কারণ, কওমি শিক্ষা সনদের স্বীকৃতি নিয়ে মহাজোটের অন্যান্য শরিকদের মধ্যে অস্বস্তি রয়েছে।

কুষ্টিয়া ইসলামিক ইউনিভার্সিটির আল কুরআন এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের প্রফেসর ড. হাফেজ এবিএম হিজবুল্লাহও তেমনটি মনে করেন। তিনি ইসলাম টাইমসকে বলেন, স্বীকৃতি ও ভোট ভিন্ন ভিন্ন জিনিস। পরস্পরের সাথে কোনো সম্পর্ক নেই। অনেকে মনে করছে কওমি শিক্ষা সনদের স্বীকৃতির কারণে আওয়ামী লীগ অনেক ভোট পেয়ে যাবে। কিন্তু আমি বিষয়টি তেমন মনে করি না।

দেশের প্রবীণ আলেম ও বাংলাদেশ কওমি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড বেফাকের সহ-সভাপতি আল্লামা আযহার আলী আনওয়ার শাহও মনে করেন, ভোটের রাজনীতিতে কওমি শিক্ষা সনদের স্বীকৃতির তেমন কোনো প্রভাব পড়বে না। তিনি বলেন, ‘সরকারের কী ইচ্ছা তা আমি জানি না। তবে আমার মনে হয় না এর ফলে ভোটের রাজনীতিতে খুব বেশি প্রভাব পড়বে।’

স্বীকৃতি দেয়ার পেছনে সরকারের রাজনৈতিক ইচ্ছাকে বড় করে দেখানোর কোনো সুযোগ নেই বলে দাবি করেন ড. হিজবুল্লাহ। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘সরকারও সেটা দাবি করেনি। আর আমাদের আলেমরাও ভোট দেয়ার অঙ্গীকার করেননি। সরকার দেশের বৃহৎ একটি অংশকে শিক্ষা স্বীকৃতির ভেতর আনার প্রয়োজন মনে করে স্বীকৃতি দিয়েছে। অন্যদিকে আমরাও নানা কারণে স্বীকৃতিগ্রহণকে প্রয়োজন মনে করে স্বীকৃতি নিয়েছি।’

তবে এই শিক্ষাবিদ আলেম কারো মাধ্যমে স্বীকৃতির রাজনৈতিক অপব্যবহারের আশঙ্কা উড়িয়ে দেননি। ড. হিজবুল্লাহর ভাষায়, ‘কেউ নিজের স্বার্থে ব্যবহার করছে আবার কেউ ভুল বুঝে বিরোধিতা করছে। ভালো হলো স্বীকৃতিকে রাজনীতির সাথে না জড়ানো।’

আল্লামা আনোয়ার শাহ বলেন, ‘বাইরের (কওমি ধারার) যারা স্বীকৃতির প্রভাবকে ব্যবহার করার চেষ্টা করছেন তাদের ব্যাপারে আমি মন্তব্য করতে চাই না। তবে ভেতরের যারা করতে চাইছেন হেফাজতের সময় তাদেরকে প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকায় দেখা গেছে। এরা চিহ্নিত।’

এই দুই আলেম ও শিক্ষাবিদের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, স্বীকৃতির প্রভাবকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহারে চেষ্টা কতোটা সফল হবে? উভয়ের মত হলো, না, সফল হবে না।

প্রফেসর ড. হিজবুল্লাহ আরেকটু যোগ করে বলেন, ‘স্বীকৃতির বিষয়টির সাথে রাজনীতি জড়িয়ে গেলে সরকারের জন্যও ভালো হবে না। অন্যদের জন্যও ভালো হবে না। কারণ, সরকার যদি স্বীকৃতিকে বড় করে প্রচার করতে চায় তবে তার বিরুদ্ধে বলার মতো আরও অনেক কথা আছে। নিশ্চয় সরকার চাইবে না সেসব কথা উঠুক। অন্যরা বিষয়টির অপব্যবহার করতে চাইলে জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি বাড়বে। তাদেরও মুখোশ খুলে পড়বে।’

আল্লামা আনোয়ার শাহ হেফাজত আমির ও হাইয়াতুল উলয়ার চেয়ারম্যানের ব্যাপারে যে বিভ্রান্তিমূলক কথা ছড়ানো হচ্ছে তার উত্তর দেন।

তিনি বলেন, ‘মানবিক কারণেই আমরা সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞ। কারণ সরকার আমাদের দাবি মেনেছে, অন্যরা মানেনি। কারো মানসিকতা যদি হয় ‘এই হাত থেকে নেয়া যাবে না, ওই হাত থেকে নিতে হবে’-এমন আবদার থাকে, তবে তাদের ব্যাপারে আমি বলবো, অন্য হাতের অপেক্ষাও আমরা করেছি। কিন্তু নিরাশ হয়েছি। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি কেউ ইসলামপ্রিয় নয়। তারা আমাদের জন্য যা করবে তাদের স্বার্থে করবে। সুতরাং আমরা আমাদের স্বার্থ দেখবো এটাই তো যৌক্তিক।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি বিএনপির সময়ে গঠিত কমিটিতে কাজ করেছি। একাধিকবার শিক্ষা সচিবের সাথে বৈঠক করেছি। সব ঠিকঠাক, স্বীকৃতি হয়ে যাবে। কিন্তু শরিক একটি দলের বিরোধিতার মুখে শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। আমার ধারণা সেই দলটিই এখন ‘জাত গেলো জাত গেলো’ বলে রব উঠিয়েছে।’

সরকার ভোটের রাজনীতিতে কওমি শিক্ষা সনদের সুফল পাবে কিনা তা হয়তো সময় বলে দেবে। কিন্তু স্বীকৃতির রাজনৈতিক অপব্যবহার যেন কেউ না করে তা কওমি শিক্ষা ধারার লাখো ছাত্র-শিক্ষকের প্রাণের দাবি। এমনটিই মনে করছেন কওমি শিক্ষাধারার অধিকাংশ ছাত্র-শিক্ষক ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা। সৌজন্যে : ইসলামটাইমস24