শনিবার, ১০ নভেম্বর, ২০১৮ ইং ২৬ কার্তিক, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ,১ রবিউল-আউয়াল, ১৪৪০ হিজরী

মাদ্রাসা-মনস্তত্ত্ব

AmaderIslam.COM
অক্টোবর ২৫, ২০১৮
news-image

জাকির তালুকদার : কওমী মাদ্রাসার তালেবে এলেম। সে জানে বা একসময় জেনে যায় যে, এই পৃথিবীর চলমানতার সাথে নিজের সাযুজ্য খোঁজার চেষ্টামাত্রই তার কাছে অর্থহীন। কারণ তাকে তৈরি করা হয়েছে পুরোপুরি পরকালের কথা মাথায় রেখে। কিন্তু জীবন তো চূড়ান্ত মাত্রায় ইহকালীন। রোজকার প্রতি-লোকমা ভাতের মতো বাস্তব। তাকে বোঝানো হয়েছে কওমের সর্বোচ্চ খেদমত করছে সে আল্লা-রসুলের বাণী এবং বিধান শিক্ষা করে। বিনিময়ে খোদা তার রিজিকের ব্যবস্থা করবেন। কিন্তু সে তো ভবিষ্যতের দিকে তাকাতে শিখলে নিজের জন্য একরাশ অন্ধকারই কেবল দেখতে পায়। তাই ভবিষ্যতের দিকে তাকানো বন্ধ করে সে নিজের বর্তমান জীবনের মধ্যেই মনকে গুঁজে দিতে চায় মরুভূমির উটপাখির মতো। বাইরে তাকাতে নিষেধ করেছেন উস্তাদরা। কিন্তু বাইরে তো তাকাতেই হয়। বাইরে না তাকাতে চাইলেও ‘বাহির’টা শত বাধা সত্ত্বেও হুড়মুড় করে ঢুকে পড়তে চায় ভেতরে। ‘বাহির’ কী বাতাসের মতো সর্বত্রগামী!

তাকে শেখানো হয়েছে তার পরনের যে পোশাক, একমাত্র সেটাই ইসলাম সম্মত, আল্লাহর নির্দেশিত পোশাক। ইহুদি-নাসারাদের পোশাক পরা চলবে না। এই পোশাকটাই আল্লাহর চোখে সবচাইতে সম্মানিত এবং সুন্দর। সে এই পোশাককে যতখানি পারে সুন্দরভাবে বিন্যস্ত করে রাখার চেষ্টা করে। নিজের হাতে পরিষ্কার করে। সেই পোশাকের জেল্লা বজায় রাখার জন্য যতদূর সম্ভব চেষ্টা করে যায়। কিন্তু সে যখন রাস্তায় বের হয়, নিজেকে তার অন্য সবার চেয়ে সুন্দর মনে হয় না। এই পোশাক কারো চোখে সৌন্দর্যবোধের দৃষ্টি ফোটায় না। বরং কারো কারো দৃষ্টিতে তাচ্ছিল্য। সেই দৃষ্টির সামনে সে কুঁকড়ে যায়। পারলে নিজের শরীরটাকে বেঁকিয়ে মাটি-আশ্রয়ী সরিসৃপের মতো গোল বানিয়ে ফেলে। এদেশের মেয়েরা পথে-ঘাটে রোজ শত শত এই পোশাকের মানুষ দেখে। তবু তার পোশাকের দিকে তাকায় এমনভাবে যেন ভিনগ্রহের কোনো প্রাণী দেখছে। কোনো কিশোরী-তরুণী-যুবতীর স্বপ্নকল্পনায় এই রকম পোশাকধারী কারো কোনো অস্তিত্ব নেই। তারা স্বপ্নে যে রাজপুত্তুরকে দেখে, তার পরনে এমন পোশাক দুঃস্বপ্নেও কল্পনা করা যায় না। কেউ তাকে বলেনি মেয়েদের এই স্বপ্নবৃত্তান্ত। কিন্তু সে বুঝে নিয়েছে নিজের ভেতরের এক বাসিন্দার সাথে কথোপকথনের মাধ্যমে।

হাটবারে অন্যদের সাথে তাকেও মাঝে মাঝে পাঠানো হয় হ্যান্ডমাইক আর মাটিতে বিছানোর দুইটি খেজুর-চাটাই দিয়ে। তারা হাটের ভিড়াক্রান্ত একটি জায়গায় নিজেরা বসে একটি পাটিতে, আরেকটি বিছানো থাকে সামনের মাটিতে হাটুরেদের করুণা ধারণ করার জন্য। তারা মাইকে অবিশ্রাম এবং তারস্বরে হাটের মানুষকে পরপারের পাড়ানির কড়ি সঞ্চয়ের কথা মনে করিয়ে দিয়ে দান-ধ্যানের আহ্বান জানাতে থাকে। যতক্ষণ হাট চলবে ততক্ষণ তাদের এই কাজ। মাঝে মাঝে চাঁদার রসিদ বই হাতে তাকে পাঠানো হয় দোকানে দোকানে, বাড়িতে বাড়িতে। কখনো কখনো তাকে উঠতে হয় দূরগামী বাসগুলোতেও। যাত্রীদের করুণা আকর্ষণে বাসের ইঞ্জিন আর হর্নের সাথে পাল্টা দিয়ে গলা ফাটাতে হয় তাকে। এইসব করতে যে লজ্জা ঘিরে ধরতো প্রথম প্রথম, একসময় সেই লজ্জা উধাও হয়ে যায়। মনে হতে থাকে এটাই তার কাজ। অনির্দিষ্ট কাল পর্যন্ত এটাই তাকে করে যেতে হবে। টেলিভিশন তার কাছে একটা শয়তানি বাক্স। সেখানে চব্বিশ ঘণ্টা কেবল শয়তানি ওসওয়াসা। টেলিভিশন মানে সেখানে নারীপ্রাধান্য। আর নারী হচ্ছে দোজখের দরজা।

হীনম্মন্যতা থেকে আসে নিদারুণ অনাসক্তি। উপযুক্ত ইন্ধন পেলে জ্বলে যে উঠবে তা তো আমরা দেখছি মুসলিম বিশ্বের অনেক দেশে। হীনম্মন্যতা এবং অবহেলা থেকে অবচেতনে গড়ে ওঠে চরম প্রতিহিংসাপ্রবণতা এবং বিকৃতি। আর ব্যক্তিত্বহীনতা তাকে ধাবিত করে যে কোনো পথে। তার প্রকাশ আমাদের দেশেও শুরু হয়েছে। দেখা গেছে বিভিন্ন সময়। তাদের সিঁড়ি বানিয়ে ক্ষমতার ধাপে পা রাখতে চায় তাদের বড় উস্তাদ। প্রয়োজনে তাদের বানাতে চায় তালেবান। তার নিজের ইচ্ছার যেহেতু মূল্য নেই, তাই সে উস্তাদদের হাতে একতাল নরম মাটির মতো, তিনি যে আকার দেন সেই আকার ধারণ করতে বাধ্য হয়। লেখক : কথাসাহিত্যিক