শনিবার, ১০ নভেম্বর, ২০১৮ ইং ২৬ কার্তিক, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ,১ রবিউল-আউয়াল, ১৪৪০ হিজরী

‘হেফাজতের কেউই এখন আর ১৩ দফা কী কী বলতে পারবে না’

AmaderIslam.COM
অক্টোবর ৩১, ২০১৮
news-image

মনযূরুল হক :

  • মাওলানা উবায়দুর রহমান খান নদভী সম্প্রতি নানা কারণে আলোচনার কেন্দ্রে আছেন। হেফাজতের কেন্দ্রীয় নেতা হয়েও ভিন্ন সুরে কথা বলছেন। চলমান ইসলামি রাজনীতির গতিপথ বদলে দেওয়ার আওয়াজ তুলে সমালোচনার মুখেও পড়েছেন। গত ৬ অক্টোবর শনিবার কবি সাইফ সিরাজ ও সাংবাদিক এহসান সিরাজসহ আমরা তিনজন দৈনিক ইনকিলাবে তার সামনে হজির হলাম। লক্ষ্য ছিল, তার সম্পর্কে মাঠে-ময়দানে ছড়িয়ে পড়া আলোচনার বিষয়ে তার সঙ্গেই কথা বলা। বাদ আছর তার ডেস্কের সামনে বসে প্রথমেই চোখে পড়ল তিনি ফেসবুকে কিছু একটা পোস্ট করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সুতরাং আমরা প্রশ্নটি উপস্থাপন করার মওকা পেলাম।

-ফেসবুকে মাওলানা নদভী নামে একটা আইডি আছে, সেটা কি আপনি পরিচালনা করেন?

-হ্যাঁ, আমার, আমার। আমার আরও পাঁচ-ছয়টা আইডি আছে।

-কিছুদিন আগে ইসলামি আন্দোলনের একটি কর্মসূচির বিষয়ে মাওলানা নদভী আইডি থেকে একটা লেখা পোস্ট করা হয়েছিল। তখন গাজি আতাউর রহমান (ইসলামি আন্দোলনের যুগ্ম মহাসচিব) লিখেছিলেন, এই লেখা নদভী সাহেবের হতে পারে না।

-ওটা তো বলবেনই। যখন যার পক্ষে যায়, তখন তিনি সমর্থন করেন। আবার যখন বিপক্ষে যায়, তখন তিনি মনে করেন, এই বক্তব্য আমার না।

-তাহলে মাওলানা নদভী আইডিটা আপনার?

-আমারই। আমার আরও সাত-আটটা আইডি আছে। আমি এবং আমার আরও কিছু লোকজন আছেন তারা পরিচালনা করেন।

-কিন্তু বক্তব্য আপনারই…

-হ্যাঁ, আমারই বক্তব্য। সরকারিভাবে তো একজন নিজের নামে দুটির বেশি আইডি ব্যবহার করতে পারে না। তাই অন্যগুলো অন্য নাম আছে। কোনোটা মধ্যপ্রাচ্য-আরবদের সাথে যোগাযোগ করার জন্য। কোনোটা তুরস্ক-মালয়শিয়ার মুভমেন্টের সাথে যোগাযোগ করার জন্য।

-আরও কিছু প্রশ্ন ছিল। যদি আপনার অনুমিত হয়, তাহলে বলবো।

-হ্যাঁ, হ্যাঁ, অবশ্যই বলেন। আমি প্রশ্নকে সবসময় স্বাগত জানাই।

-কোথাও বলছিলেন, আলেমদের ঐক্য দশ মিনিটের ব্যাপার। এটা কিভাবে?

-হ্যাঁ, আগে ভয়ে বলেছিলাম দশ মিনিট, এখন আরও কমিয়ে দিলাম, মাত্র দুই মিনিটের ব্যাপার।

-এইটা কার হাতে আছে, ওই যে বললেন ঐক্য। কার কাছে গেলে তারা ঐক্যবদ্ধ হতে পারবেন?

-সেইটা তো থাকে ইহুদিদের হাতে।

-তাইলে আপনি কিভাবে বললেন যে, দুইমিনিটের মধ্যে সম্ভব। যদি আপনার হাতে নাই থাকে। একজন শীর্ষস্থানীয় আলেম হিসেবে আপনি কি দায় এড়াতে পারেন?

-না, দায় আমারও আছে। আমি চেষ্টাও করেছি। বিভিন্নজনের সাথে কথাও বলেছি। হয় নাই। আমি এজন্যে যত চেষ্টা করেছি, তা মনে হয় অন্য কেউ আর করে নাই।

-খবরে এসেছে, যানজটে বাংলাদেশে দৈনিক ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়। সেখানে আলেমগণ ঐক্যের জন্যে ১০ মিনিট সময় দিতে পারছেন না?

-চমৎকার প্রশ্ন। বেশ চমৎকার প্রশ্ন করছেন আপনারা। (তিনি এতক্ষণে কম্পিউটার থেকে মুখ ঘুরিয়ে প্রশ্নকর্তাদের দিকে ফিরলেন।)

-শাপলা-হেফাজত নিয়ে সম্প্রতি একটি বই প্রকাশ হয়েছে। বিশ্বাসের বহুবচন। সেখানে আপনার লম্বা একটা ইন্টারভিউ আছে। সেখানে দেখলাম আপনি ওই সময়টায় সরকার মহলে দৌড়োদৌড়ি করেছেন খুব। এবং তাদেরকে জানানোর চেষ্টা করেছেন। আপনাকে দুই ঘণ্টা সময় দেয়া হয়েছিলো। আপনি কি তখন শাপলায় যারা অবস্থান নিয়েছিলো, যারা নিহত হয়েছে, আহত হয়েছে তাদেরকে জানিয়েছিলেন? অর্থাৎ একটা ম্যাসাকার যে হতে যাচ্ছে, আপনি বুঝতে পারছেন, সেটা…

-বইয়ের মধ্যে তো সবই আছে। আপনি বইটা পড়েন।

-ওইখানে স্পষ্ট করে ওইরকম কিছু নেই।

-লেখাটা মনযোগ দিয়ে পড়েন আবার। ওই সময় কি কোথাও যাওয়া আসার অবস্থা ছিলো? কোথাও কেউ মুভ করতে পারছে? সম্ভব ছিলো না। আমি মোবাইলে সবাইকে জানিয়েছি। লালবাগ গেয়েছি। আমি যা করছি তারচে’ বেশি করা আর আমার পক্ষে সম্ভব ছিলো না। আর মঞ্চে গিয়ে বললে তো আমাকে মেরে ফেলতো। কাফের হিসেবে বা নাস্তিক-টাস্তিক বলে।

-পরবর্তীতে এই সরকারের কাছ থেকে স্বীকৃতি নেওয়াটাকে আপনি কিভাবে দেখেন? অনেকেই বলে, ‘যারা মারলো তারাই আবার স্বীকৃতি দিলো।’

-মাইর আর স্বীকৃতি দুইটা দুই জিনিস। এক সাথে করবেন না। দুইটারে না মিলানোটা হলো সহজ। ধরেন, একজন আমাকে দোকানে বেঁধে পিটিয়েছে। তার কাছে আমার টাকা পাওনা আছে। পরে আবার টাকা দিছে। টাকাটা নিয়ে নিলাম। আবার আমার ভাতিজারা ছুড়ি নিয়ে ঘুরতেছে, তারে মারবে। এখন যদি কেউ জিজ্ঞেস করে, যে তোমারে মারলো তার কাছ থেকে আবার টাকা নিয়েছো কেনো, এটা কোনো প্রশ্ন হলো! মাইর আর স্বীকৃতিকে এক করা যাবে না।

-এখন যে সংবর্ধনা দেওয়া হবে, ওটা বাড়তি হয়ে যাবে না?

-ওইটা আহমদ শফি সাবরে জিজ্ঞেস করেন। আমি উনার কেবিনেট না। আমি আমার মত দিতে পারি। আপনি পারেন, উনি পারে।

-আপনি তো হেফাজতের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক। সেই জায়গা থেকে কিভাবে দেখছেন?

-কয়দিন আগে যে আমাদের একজন নায়বে আমির পদত্যাগ করলেন, মুহিববুল্লাহ বাবুনগনরি। উনার বক্তব্য শোনেন নাই। উনি তো বলছে হুজুর (আহমদ শফি) জীবনে কোনো দিন মিটিং ডাকে নি। উনার বক্তব্যেই আপনার প্রশ্নের জবাব আছে।

-এইগুলো তো আপনাদের দায়িত্ব, জাতির সামনে স্পষ্ট করা। আর না হলে জাতি তো বারবার বিভ্রান্ত হবে।

-জাতির সামনে স্পষ্ট করা যেটা, সেটা দরকার না কম দরকার, আমরা বুঝি। জাতিটা কে? আহমদ শফি সাহেব কে? আহমদ শফি কি জাতির শত্রু?

-এই বক্তব্যটা নিয়ে আপনার কোনো মত আছে কিনা, যে বক্তব্যটা দিলেন তিনি, ‘আওয়ামী লীগ হলেও আমার আপত্তি নাই।তাদের মধ্যেও অনেক দীনদার লোক আছে, যারা মোটা অংকের টাকা দেয় মাদরাসায়’।

-এইখানে আপত্তি করলে করা যায়, নাও করা যায়। বুঝেন তো। কারণ, উনি কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তি না। দ্বিতীয়ত উনার একটা মাদরাসা আছে, যেখানে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা খরচ হয়। যেটা পাবলিকের কাছ থেকেই আসে। আর সেটা সবার জন্য উন্মুক্ত। উনি কথাটা ঠাট্টা করে বলছেন। কথাটার সেন্স বুঝতে হবে। কথাটার সেন্স না বুঝলে মানুষ বুঝবে না। একজন বলতেছে যে, আমাকে বলছে আমি নাকি বিয়ে করেছি। দ্বিতীয় বিয়ে করেছি। আমি করি নাই। যে বলেছে সে কমবখত। এই রকম পঞ্চাশবার বলার পর বলেছে, করলেই ক্ষতি কি। করলেও আপত্তি নেই। আগের কথাগুলো প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর, শেষ কথাটা থাকে না। উনি (আহমদ শফি) বলেছেন, আওয়ামী লীগে আপত্তি নাই। কিন্তু আমি হই নাই, আমি হই নাই এই কথাটা বারবার বলেছেন। যারা বলছে তাদেরকে তিনি কমবখত বলেছেন। উনার কথা পরিস্কার। উনার কথায় সরলতা ছাড়া- আমি কোনো ফাঁক দেখছি না।

-কওমি মাদরাসায় স্বীকৃতির বিষয়ে অনেকেই প্রশ্ন করেছেন, পুরো শিক্ষাধারায় স্তর বিন্যাস নাই। অন্য কোনো পরীক্ষার স্বীকৃতি নাই, সোজা দাওরাকে মাস্টার্স সমমান দেওয়া হয়েছে। প্রশ্নটা বারবার করা হয়।…

-সেই প্রশ্নটা আপনাদের করা উচিত না। কারণ যারা পার্লামেন্টে বা সরকারে আছেন তারা চৌদ্দশ বছর আগেকার না। বর্তমান বিশ্বে বসবাসকারী আধুনিক একটা শিক্ষিত সরকার। তারা যদি দিতে পারে, তাহলে আমরা নিতে পারি না কেনো? হওয়া সম্ভব বলেই হয়েছে। বাংলাদেশের এরকম কোনো আইনে কি আছে যে, সব স্তর পুরণ করার পরই কেবল সে এমএ সনদ পাবে। এরকম আইন থাকলে তো ওইটা হইতো না। ওই আইন নাই বলেই তো এই আইনটা পাশ হয়েছে। আইন বুঝতে হবে। সুযোগ আছে বলেই তারা দাওরায়ে হাদিসকে আরবি এবং ইসলিমিক স্ট্যাডিজে মাস্টার্স সমমানের স্বীকৃতি দিয়েছে।

-এই স্বীকৃতির পরিণাম কী হবে, অনেকে আবার তা নিয়েও ভাবার কথা বলেন…

-পরিণাম নিয়া এত ভাববেন না। পরিণাম নিয়া যদি ভাবেন, তাহলে তো বিয়াশাদিও করতে পারবেন না, সন্তানাদি জন্মও দেওয়া যাবে না। বাংলাদেশের মতো একটা দেশে নতুন একটা বাচ্চা জন্ম দেওয়া, এইটা তো পরিণামের ভয়ে না করাই উচিত। আপনার তো রাস্তায়ই বের হওয়া উচিত না পরিণামের চিন্তা করলে। তেমনি স্বীকৃতি যেটা হয়েছে, সেটা সামাজিকভাবে ভালো শোনা যায়। কেউ যদি শোনে যে, আপনার শরীর আগের যে ভালো হয়েছে, তো সবারই ভালো লাগবে। স্বীকৃতির কারণে মনঃস্তাত্বিকভাবে একটা ভালো তো হয়েছে, আগে যে নিরক্ষর অবস্থানে ছিল সে এখন মাস্টার্স সমমান পেয়েছে, এটা তো হয়েছে, নাকি?

-বর্তমান যে সিলেবাস আছে, সেটাকে কি সঠিক মনে করেন?

-বাংলাদেশে প্রচলিত সমস্ত শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে ভালো মনে করি।

-একটু রাজনৈতিক প্রশ্ন করি?

-করেন। করেন।

-নির্বাচন নিয়ে সংকট চলছে, ক্ষমতাসীন সরকার তত্ত্বাবধায় সরকার দিচ্ছে না, বা সংসদ ভেঙে দেবে কি না বলছে না, এই ব্যাপারে আপনার মতামত কী?

-আমার মতামত হলো, সংবিধানে যা আছে সেই অনুযায়ী নির্বাচন করার অধিকার সরকারের আছে।

-সরকারবিরোধীরা তো আগের নির্বাচন অনুযায়ী সরকারের নৈতিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন আনেছন। আপনার মত কী?

-এই সরকারের নৈতিক বা সবদিক দিয়েই বৈধতা আছে। সংবিধানে আছে, যদি একজন প্রার্থী থাকে, তার বিপক্ষে না দাঁড়ায় তাহলে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সে নির্বাচিত বা বিজয়ী। এই এমপি এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে নির্বাচিত এমপির মধ্যে নৈতিক কোনো পার্থক্য আছে কি সংবিধানে? যারা অনৈতিক বলে তারা ভুল বলে। এই সরকার বৈধ, নৈতিক এবং ঠিক।

-ইসলামের দৃষ্টিতে কি এ-জাতীয় সংকট মোকাবেলার কিছু বলা যায়?

-ইসলামের কথা এখানে আইনেন না, কেননা, আমাদের দেশের কোনো কিছুই ইসলামের মতে চলে না।

-আপনি তো হেফাজতের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক। ৫ মের আগ পর্যন্ত এবং পরেও কিছুদিন আপনাকে অ্যক্টিভিস দেখা গেলেও এখন আর তেমনটা দেখা যাচ্ছে না। কারণটা কী?

-হেফাজতের কোনো কেন্দ্রীয় বা স্থানীয় কোনো কমিটির কোনো পদেই আমি কখনো ছিলাম না। এইটা আমার বইয়েও আমি লিখেছি। যখন প্রয়োজন হতো, তখন হেফাজত নেতৃবৃন্দ আমার কাজটাকে ব্যবহার করা বা বিধিসম্মত করার জন্য আমাকে এই পরিচয়টা দিতেন। এবং এই পরিচয়টা আমিও দিতাম। আসলে আইনগত বা কাগজে-কলমে কোনো পদে আমি ছিলাম না। আমি কর্মী হিসেবে কাজ করেছি। হেফাজতের কাজকর্ম তখন বেশি ছিলো, এজন্য আমারও কাজ ছিলো। এখন মাঠে-ময়দানে হেফাজতের কাজকর্ম তেমনটা নাই, এ জন্য আমারও নাই।

-হেফাজতকে নিয়ে রাজনৈতিক ময়দানে আলোচনা হচ্ছে প্রায়ই। শোনা যাচ্ছে, সরকারের পক্ষ থেকে ২০ আসন নিয়ে হেফাজত নির্বাচন করতে চায়?

-এই ধরনের রাজনৈতিক আলোচনা হেফাজতে কখনো হয় নাই। এইগুলো বাইরে আলোচনা হয়। হেফাজতের আমির বা মহাসচিব কেউই কোনো সময় বলেননি যে, উনারা রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়েছেন, উনারা আসন চান বা ক্ষমতার ভাগ নিবেন।

-কিন্তু হেফাজতের নেতাদের উদ্ধৃতি দিয়ে তো মাঝেমধ্যে মিডিয়ায় এসব খবর আসে প্রায় সময়ই।

-এইসব বক্তব্য যারা দেন তারা হেফাজতের পক্ষ থেকে বলেন না। তারা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের লোক। হেফাজতের সাথেও আছেন। হেফাজতে তো রাজনৈতিক ব্যক্তিদের আসা নিষেধ নেই। সবাই আসতে পারে। নির্বাচন নিয়ে বা রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তারা তাদের দলীয় অবস্থান থেকে বক্তব্য দিচ্ছেন, এখানে হেফাজত জড়িত না। রাজনৈতিক ব্যক্তিরা যেহেতু হেফাজতের সাথে আছে, তাই তাদের বক্তব্য শুনে মানুষ মনে করে নেয়, এটা হেফাজত বলেছে।

-এই প্রসঙ্গে আরেকটা প্রশ্ন আছে। শোনা যায়, যখন হেফাজতের আন্দোলন চলছিলো, তখন ১৩ দফা নিয়ে আপনি ঘোর বিরোধিতা করেছিলেন। আপনি নাকি বলেছিলেন, দফাগুলো আরো সংক্ষিপ্ত হওয়া দরকার?

-এটা আসলে ঘোর বিরোধিতা না। ১৩ দফা যখন তৈরি হয়, তাড়াহুড়ো করে যারাই করেছেন, করেছেন। আমি এটা ৩ দফায় নিয়ে এসেছিলাম। লেখক বা সম্পাদক হিসেবে আমার যেই দক্ষতাটা আছ। যেহেতু ওখানে অনেকগুলো বিষয়। আর যত বিষয়, যত বাক্য, যত কথা, ততোই বিতর্ক। টকশোতে এইগুলো নিয়েই কিন্তু হৈচৈ হতো। আমি তাই এটাকে ৩ দফায় নিয়ে এসেছিলাম, এ ব্যাপারে সবাই একমত হননি বা অনেকে গ্রহণ করেননি বলে আর হয়নি।

-দফাগুলো বেশি হওয়ার কারণেই কি আন্দোলনে কিছুটা…

-কিছুটা না। আপনি দেখবেন, হেফাজতের কেউই এখন আর ১৩ দফা কী কী বলতে পারবেন না। সাধারণ আলেম- উলামা বলতে পারবেন না। জনগণ বলতে পারবে না। যখন আপনার দফাগুলো মানুষ বলতে পারে না বা এইটাকে তারা নিতে পারেনি, তখন এই আন্দোলানে তারা কিভাবে সম্পৃক্ত হবে? তাই দফাগুলো সবসময় মানুষের জন্য বোধগম্য ও সহজেই মনে রাখা যায় এমন হওয়া উচিত।

-কওমি স্বীকৃতিকে কি হেফাজতের আন্দোলনের সফলতা বলা যায়?

-হেফাজতের আন্দোলনের যে সফলতা, সেটা যদি হিসাব করা হয়, তাহলে তা দিয়া থিসিস করা যাবে, পিএইচডি করা যাবে। হেফাজতের ১৩ দফা বললেও কত দফা যে এখানে পূরণ হয়েছে, তা নিয়ে বিস্তারিত বলা শোভনীয় হবে না, যেহেতু এখানে সরকারের অনেক বিষয় জড়িত। কওমি স্বীকৃতিকে তার সফলতার মধ্যে একটামাত্র উদাহরণ বলা যায়।

-শাপলা চত্বরে যারা শহিদ হয়েছেন, তাদের কোনো তালিকা হেফাজতের কাছে আছে কি না। এই প্রশ্ন সবসময়ই ওঠে, সত্যিকার অর্থে কতজন মারা গেল?

-এটার দায়িত্ব তো সরকারের। যারা শাসক, তারা যদি মানুষকে মারেন, তাহলে কতজন মারছেন, সেটা জানানো তাদের দায়িত্ব। কারণ, নাগরিক হারায়ে যায় না। একটা মানুষের অস্তিত্ব এমনি এমনি নাই হয়ে যায় না। আমরা তো সারাদিন দেখেছি, তিনজন চারজন পাঁচজন ছয়জন করে সারাদিন লাশ আসতেছিল। গুলিস্তান থেকে শুরু করে বায়তুল মোকাররম পর্যন্ত এলাকার মানুষগুলোকে যে হত্যা করা হয়েছে, মাদানিনগরে যে-সকল লোককে মারা হয়েছে। তারপর রাস্তা পরিস্কার করার সময় যে-ধরনের যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হয়েছে, অন্ধকার করা হয়েছে, বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, মানুষকে জবাই করা হইতেছে, লাঠি দিয়া পিটায়া মাইরা ফেলা হইতেছে, বাঁশ দিয়া মরা লোকদেরকে আরও পিটাইতেছে, এমন আরও দশ-পনেরোটি ছবি আছে। যদি ত্রিশজন লোক মরে, তাহলে সেটা কি এনাফ না? ত্রিশ হাজারই হইতে হবে? বাংলাদেশে ত্রিশ লাখ যে শহিদ হইছে, তার তালিকা আছে? বিশ্বমিডিয়া তো বলতেছে শাপলায় দশ হাজার লোক মারা গেছে। অনেকে তিন হাজার বলছে, কেউ চার হাজার বলছে। এইজন্য আমরা জানি না, কতজন মারা গেছে।

-কওমি মাদরাসায় জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া, এখন যেই জাতীয় সঙ্গীত আছে, এটা গাওয়া নিয়ে আপনার মত কী?

-এটা নিয়ে আমার অভিমতের তো প্রশ্ন থাকে না। এটা নিয়ে দেশে আইন আছে, নাগরিক হিসেবে সবাইকে গাইতে হবে।

-ইসলামকে সামনে এনে যদি কেউ প্রশ্ন করে, একজন মুসলিম হিসেবে সেটা গাওয়া যায় কিনা? যেহেতু সেখানে বাদ্য-বাজনা থাকে কখনো।

-সেটা অন্য প্রশ্ন। আমাদের জাতীয় সঙ্গীতের আইনে লেখা আছে ‘স্কুলে… স্কুল শুরুর সময় স্কুলের বাচ্চারা এসেমব্লি করে গাইবে। এবং কয়েকটা লাইনে সীমিবদ্ধ। যেখানে গাওয়া কথা আছে, সেখানে তো চলছে। এখন আপনি আইনে যদি বলেন মাদরাসা… তাহলে মাদরাসা আপনাকে বুঝতে হবে। মাদরাসা তো স্কুল না। স্কুল হলো প্রাথমিক পর্যায়। স্কুলের পরে নিম্ন মাধ্যমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক এর পরে গ্রাজুয়েশন মাস্টার্স সব শিক্ষাঙ্গন আছ। অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ওই সব জায়গাতে তো গাওয়া হয় না। প্রাইেভট ইউনিভির্সিটিতে হয় না। মাদরাসায় মাস্টার্স পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা আছে আবার স্কুল পর্যায়ের শিক্ষার্থীরাও আছে। এখন যারা মাদরাসার ছাত্রদের গাইতে বলেন, একজন মহিলা এমপি দেখলাম বলছেন, উনি আসলে সংবাধিনা পড়তে পারেন কি না আল্লাহ জানে।

-গাওয়াটা যদি আইন করেই বাধ্য করা হয় বা গাইতেই হবে বলা হয়, তখন এইটার প্রতিক্রিয়া কী হবে?

-প্রতিক্রিয়া কিছুই হবে না। আমার তো ধারণা, আইন যদি করা হয় বা করতে বলা হয়, তাহলে আইন করার আগে যে-কোনো সরকার সে আইনের যারা স্টেক হোল্ডার বা অংশীজন তাদেরকে নিয়ে বসে আইন করবে।

-মাওলানা ফরীদউদ্দীন মাসঊদ সাহেবকে কিভাবে মূল্যায়ন করেন?

-তাকে কিভাবে মূল্যায়ন করি, তার আগে জানতে চাই ওনার ব্যাপারে আলাদা করে মুল্যায়নের প্রশ্ন কেন আসে?

-আপনি তো অবশ্যই জানেন, কেনো প্রশ্ন আসে…

-এই যে প্রশ্ন আসা, এটাই ভুল। আমাদের মন-মানসিকতার সমস্যা আছে।

-তিনি ‘জমহুরের’ মতের বাইরে গিয়ে কাজ করেন…

-আমাদের বাংলাদেশে যে জমহুর হয়ে আছে, তাদের মূল চিন্তাটা কী, তাদের চিন্তক কে এবং তাদের মুখপাত্রইবা কে? এই জমহুরের কথা বা আদর্শ বা নীতিমালা পরিবর্তন হতে কয় সেকেন্ড লাগবে? এটা আমার প্রশ্ন। আমিও জমহুরের সাথে একমত। কিন্তু আমি জমহুরের ব্যাপারে ভীত। সুতরাং এই জমহুরের সাথে ওনার বিরোধ, এটাকে আমি কিছুই মনে করি না। কারণ একসময় দেখা যাবে যে, জমহুর উনার হয়ে গেছে, অথবা উনি জমহুরের হয়ে গেছেন। আমি আপনাকে কয়টা প্রমাণ দেবো যে, যেগুলোতে জমহুর উনার মতো হয়ে গেছে। তাহলে তাকে আমরা জমহুরের বাইরে রাখবো কেনো?

-ব্যক্তিগত প্রশ্ন, আতাউর রহমান খান রহ. যেইভাবে রাজনৈতিক পথে এগিয়েছেন, তার সন্তানদের মধ্যে আপনারা কেউ সেই পথে গেলেন না।

-ওই সময়ে কিশোরগঞ্জের যেই আসনে তিনি ছিলেন, সেখানকার ৪০ ভাগ ভোট ছিল তার নিজের। আমাদেরও সেখানে অবস্থান আছে। কিন্তু আমরা সেদিকে যাই নি, সবাই যার যার মতো প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আমরা যদি প্রয়োজন মনে করি, তখন পারিবারিকভাবে পরামর্শ করে যাবো সে-পথে।

-মুহিব খানের যে রাজনৈতিক চিন্তাধারা, সে-বিষয়ে আপনার কোনো অভিমত আছে কি না?

-আমি মনে করি, বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের রাজনৈতিক চিন্তা করার অধিকার আছে। সুতরাং মুহিব খান যদি রাজনৈতিক কোনো চিন্তা করে থাকে, তাহলে আমার মত বা অমতের কোনো প্রশ্ন নাই।

-পারিবারিকভাবে সেটা আপনারা চেয়েছেন কি না, কিংবা তার কার্যক্রমে আপনার সমর্থন আছে কি না?

-আমাদের সমস্ত পরিবারের সদস্যদর সব ধরনের বৈধ বা সুবৃত্তি ও কীর্তির প্রতি আমাদের সমর্থন আছে। এর অর্থ এই না যে, তার সাথে গিয়ে আমাদের যোগ দিতে হবে।

-একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে যদি তার কর্মকাণ্ড আপনার কাছে জানতে চাই…

-আমি মনে করি, মুহিব খানের কাজটা একটা অসাধারণ কাজ। বাংলাদেশে যারা আধুনিক ও ইসলামি উভয় পরিমণ্ডলের চিন্তাবিদরাও এমন একটা কিছু গড়তে পারেনি। এমনকি অনেক বড় দল, যারা ক্ষমতায় আছে বা ছিল, তাদেরও তেমন কিছু নাই। অনেকেই অনেক চিল্লাপাল্লা করতে পারে, কিন্তু গোছগাছ করে রাজনৈতিক সুন্দর একটা প্রোগ্রাম উপস্থাপন করার মতো মানুষ কম। তিনি সেটা পেরেছেন।

-এর মানে কি, এতদিন আমরা অনেকগুলো ইসলামি রাজনৈতিক দল দেখেছি, এখন কি সেটার সাথে নতুন একটা সংযোজন হলো?

-না, উনারটাকে ইসলামি রাজনৈতিক অন্যান্য দলের কাতারে ফেলা যাবে না। কাজেই নতুন একটা যোগ হইছে, এমন বলা ঠিক হবে না। বাংলাদেশের সব মানুষদের উপযোগী একটা রাজনৈতিক চিন্তা উনি দিছেন। তিনি বলেন নাই যে, আমি একটা রাজনৈতিক দল করে ফেলেছি। কেউ যদি তার চিন্তা কাজে লাগায়, তাহলে তার সওয়াব হবে।

-যদি কখনও কিশোরগঞ্জের জামিয়া ইমদাদিয়া থেকে পরিচালনার জন্যে আপনাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়, তাহলে আপনি যাবেন কি না ?

-আমার তো শত জায়গায় শত ব্যস্ততা। বাংলাদেশের ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনার বড় বড় মাদরাসায় তাদের যোগ্য নেতৃত্বের জন্য আমাকে ডাকে। অধিকার ও পদ সবকিছু দিয়েই ডাকে। বহু মাদরাসায় আমাকে পড়ানোর জন্যে যেতে হয়। অনেক জায়গায় ক্লাস নিতে হয়। এখানে (দৈনিক ইনকিলাব) দায়িত্ব আছে। অনেক… এ-ছাড়া সরকারি-বেসরকারি নানান ব্যস্ততা আছে। সুতরাং আলাদাভাবে একটা মাদরাসার পরিচালনার দায়িত্ব আমি নিতে পারবো না। তেমনি কিশোরগঞ্জ জামিয়া যে বড় মাদরাসা এবং তাতে যে কাজ, তা এখন আর আমার জন্যে নেওয়ার সুযোগ নাই, সম্ভব না।

-সর্বশেষ একটা প্রশ্ন। যদি আপনাকে এমন তিনটা বাক্য বলতে বলা হয়- যে তিনটা বাক্য অনুযায়ী কাজ করলে বাংলাদেশর ইসলামি অঙ্গনের রাজনৈতিক অনৈক্য দূর হয়ে যাবে। তাহলে আপনি কোন তিনটা বাক্য বলবেন?

-প্রথম. দারুল উলূম দেওবন্দের প্রতিষ্ঠা এবং এর প্রথম তিন-চারজন মুরুব্বির লক্ষ্য-উদ্দেশ্য আমরা পড়ি এবং ওই অনুযায়ী কাল থেকে আমল শুরু করি। তাহলে ওইটার উপর ভিত্তি করে ঐক্য হওয়া সম্ভব। ব্যাখ্যা বলি, হযরত শায়খুল হিন্দ [রাহ.] তার জীবনের শেষ প্রান্তে এসে বলেছিলেন দেখো, দুইটা জিনিসের অভাব আমাদের দেশে। একটা হলো, ইসলাম শিখাও- না হলে বড়দেরকে ভালো পাবা না, আরেকটা হলো এক হও। এক না হলে আমরা কিছুই করতে পারবো না।

দ্বিতীয়, আমাদের নদওয়ার শ্রেষ্ঠ সন্তান মাওলানা সাইয়্যেদ সোলাইমান নদভি এবং উনার পরের প্রজন্মের আল্লামা হজরত আবুল আলি নদভি এই দুইটা মানুষের কর্মপন্থা, লেখা, নসিহত বা রূপরেখা যদি আমরা কোনো রকম ফলো করতে পারতাম তাইলে আমাদের এই বাংলাদেশটাই আমাদের আপন হয়ে যেতো।

তৃতীয় হলো, যোগ্য নেতৃত্বকে কাজে লাগানো। যোগ্য কে- তাকে খুঁজে বের করে তার হাতে নেতৃত্ব দেওয়া। কোনো জায়গা আমি দখল করে রাখবো, অন্যলোক যোগ্য হলেও তাকে দেবো না, এমন হলে ঐক্য হবে না।

-আপনার বক্তব্য রেকর্ড হয়েছে। আমরা তা প্রকাশ করতে পারি কি না?

-পারেন। আমি সবসময় প্রকাশযোগ্য কথা বলি। সুতরাং প্রকাশ করলে কোনো সমস্যা নেই। তবে প্রকাশের আগে যদি দেখান, তাহলে আরও কিছু যোগ করার মতো থাকলে যুক্ত করে দিলাম।

-আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ। দোয়ার দরখাস্ত।

-আমারও জন্যে দোয়া করবেন।

সৌজন্যে: দ্য বাঙাল