শনিবার, ১০ নভেম্বর, ২০১৮ ইং ২৬ কার্তিক, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ,১ রবিউল-আউয়াল, ১৪৪০ হিজরী

শান্তির ধর্ম ইসলাম নিয়ে পাশ্চাত্যের ভীতি অযৌক্তিক

AmaderIslam.COM
নভেম্বর ৬, ২০১৮
news-image

মোহাম্মদ জমির : এই তিন দশকে পশ্চিমা বিশ্বে একটি ফোবিয়া দেখা যাচ্ছে। এটা হচ্ছে ইসলাম-ফোবিয়া বা মুসলমান-ভীতি, যা শান্তির ধর্ম ইসলামের মাহাত্ম্য অনেক ক্ষেত্রেই আড়াল করে দিচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মুসলিমরা। কেবল মুসলমান হওয়ার কারণে কোনো অপরাধ না করেও মানসিক ও শারীরিকভাবে নিগ্রহের ঘটনাও ঘটে চলেছে। অথচ ইসলামের যে ইতিহাস ও ঐতিহ্য তার অনেকাংশই মানবিকতার বাণীতে সমৃদ্ধ। পৃথিবীর অনেক মহৎ মানুষ সৃষ্টি হয়েছে মুসলিম সমাজ থেকে। তা আজ ভুলে গিয়ে অন্ধভাবে অনেকেই ইসলাম-ফোবিয়া ছড়িয়ে দিচ্ছে। এর দায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নিতে হবে পশ্চিমা বিশ্বকে।

সেই ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরে টুইন টাওয়ার হামলার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে জোরালো হয়েছে ইসলাম-ফোবিয়া। মার্কিন মুলুকে মুসলমান হওয়া মানেই যেন ‘পশ্চাৎপদ’, ‘রক্ষণশীল’, ‘চরমপন্থি’ কিংবা ‘নারী-স্বাধীনতার বিরোধী।’ নির্বাচনের আগে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রচারণার অস্ত্র করেছিলেন ইসলামকে। ছড়িয়েছিলেন মুসলমানবিরোধী নানা অপপ্রচার। প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর মুসলিমবিরোধী ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করেন তিনি। তার শাসনে মুসলমান পরিচয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারীদের ধারাবাহিক বঞ্চনা জোরালো হয়েছে। তবে বিপরীত বিষয় হচ্ছে ট্রাম্প কিন্তু সৌদি আরবের সঙ্গে ঠিকই ঘনিষ্ঠতা বজায় রেখে চলছেন। এখানে কাজ করছে বিশ্বরাজনীতি ও অর্থনৈতিক স্বার্থের বিষয়।

কেউ ক্ষমতা ধরে রাখতে, কেউ অস্ত্র ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে, কেউবা প্রগতিশীলতা রুখে দিতে ইসলাম-ফোবিয়াকে জিইয়ে রাখতে চাইছে। পৃথিবীর কোনো দেশে সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটলেই মুসলমানদের ওপর তার দায়ভার চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা একটি সাধারণ ব্যাপার হয়ে গেছে। আমরা কয়েক দশক ধরে এটা লক্ষ্য করছি। অথচ এফবিআই এবং ইউরোপোলের গবেষণাধর্মী রিপোর্ট থেকে ভিন্ন চিত্র পাওয়া যায়। আমেরিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যেসব সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চলেছে তার বেশিরভাগই চালিয়েছে অমুসলিমরা। বছর কয়েক আগে ‘লোনওয়াচডটকম’ নামের ওয়েব সাইটের তথ্যানুসারে, ইউরোপীয় ইউনিয়নে সংঘটিত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের দশমিক চার শতাংশ ঘটেছে মুসলমানদের দ্বারা। বাকি ৯৯ দশমিক ৬ ভাগ সংঘটিত হয়েছে অমুসলিম বা অন্য ধর্মের অনুসারীদের দ্বারা। ১৯৮০ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত আমেরিকায় যত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ঘটেছে তার ৬ শতাংশ মুসলিম নামধারীদের দ্বারা সংঘটিত হয়েছে। বাকি ৯৪ শতাংশের জন্য অন্য জাতি বা ধর্মীয় লোকজন দায়ী। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, এশিয়ার বিভিন্ন দেশসহ ইউরোপ-আমেরিকাতে কোনো সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটলেই ঢালাওভাবে বাছ-বিচার না করেই মুসলমানদের ওপর তার দায় চাপিয়ে দেওয়া হয়। এর জন্য একশ্রেণির মিডিয়াও যেন মুখিয়ে থাকে। পশ্চিমা-ঘেঁষা এই সংবাদগোষ্ঠীও ঢালাওভাবে সন্ত্রাসের দায়-দায়িত্ব মুসলিম সংগঠনসমূহের ওপর চাপিয়ে দেয়। বিপুল উৎসাহ নিয়ে তা প্রচার করে।

অথচ ইসলাম নিয়ে যারাই নিবিড় পর্যবেক্ষণ করেছেন, পড়াশোনা করেছেন, তাদের বক্তব্য হচ্ছে, ইসলামে সন্ত্রাসের কোনো ঠাঁই নেই। মুসলমানরা কোনো সন্ত্রাস করতে পারে না। ইসলাম হচ্ছে শান্তির ধর্ম বা জীবন-ব্যবস্থা। তাই এর অনুসারীরা মানুষ হত্যা করতে পারে না। কেননা, নিরপরাধ মানুষ হত্যাকে পবিত্র কুরআনে সারা মানবজাতিকে হত্যার শামিল বলে গণ্য করা হয়েছে। কাজেই কোনো মুসলমান নিছক রাগ-বিরাগের বশবর্তী হয়ে মানুষ তো দূরের কথা অন্য কোনো প্রাণীও হত্যা করতে পারে না।

সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটিয়ে কখনো কখনো মুসলিম নামধারী কিছু জঙ্গি সংগঠন নিজেদের ইসলামের অনুসারী বলে দাবি করে। কিন্তু আসলেই কি তারা মুসলিম? তারা হয় বিভ্রান্তির পথে আছে, নয়তো জেনে বা না জেনে অন্য কোনো গোষ্ঠীর প্ররোচনায় জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ছে। অবশ্যই এমন হতে পারে যে, কোনো পক্ষের হয়ে কাজ করার জন্য তাদের তৈরি করা হয়েছে।

এটা অবশ্যই স্বীকার করতে হবে যে, পশ্চিমের ইসলাম-ফোবিয়া তৈরির জন্য কিছু জঙ্গি সংগঠনও দায়ী। তাদের কারণে মুসলিম সমাজের কেউ কেউ বিভ্রান্ত হয়ে ভুল কাজ করে বসছে। যুক্তরাজ্যে এমন কিছু ঘটনা আমরা দেখেছি। যেখানে হঠাৎ কাউকে আক্রমণ করা হয়েছে। তার জন্য সেখানে ইসলাম-ভীতি বেড়ে চলছে- এ ধরনের একাধিক প্রতিবেদন ও জরিপ আমরা হাতে পাচ্ছি। তবে সেখানকার অনেক বিশেষজ্ঞই বলছেন, ব্রিটেনে ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণেই ইসলামবিরোধী হামলা চরম পর্যায় ধারণ করেছে। পলিটিকস ফার্স্ট ম্যাগাজিনের প্রতিষ্ঠাতা এবং সম্পাদক মারকাস পাপাদোপুলাসের মত হচ্ছে, ব্রিটেন এবং পশ্চিমা দেশে ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞতা খুব স্বাভাবিক ঘটনা। প্রেস টিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি আরো বলেন, ব্রিটেনের লোকজন ইসলামের বিষয়গুলো নিয়ে দ্বিধান্বিত। কারণ তারা সঠিকভাবে ইসলামের বিষয়গুলো জানে না। তারা মনে করে ইরাক ও সিরিয়ায় প্রভাব বিস্তারকারী জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট ইসলাম সম্পর্কে যা কিছু বলে তাই সত্যি। কিন্তু আসলেই সেটা নয়। পাপাদোপুলাস মনে করেন, ইসলাম হচ্ছে একটি শান্তির ধর্ম। সিরিয়ায় জঙ্গিরা যা করছে বা যা উপস্থাপন করছে সেটা ইসলাম নয়। তারা চরমপন্থা বিশ্বাস করে এবং সেটাই অনুসরণ করে। অথচ ইসলামে চরমপন্থার কোনো স্থান থাকার কথা নয়।

ইসলামবিরোধী যে ঘৃণা ছড়িয়ে পড়ছে সে সম্পর্কে একটি পর্যবেক্ষণ সংস্থা জানিয়েছে, যুক্তরাজ্যে ২০১৭ সালে বহু সংখ্যক হামলার ঘটনার কারণেই ইসলাম-ভীতি বেড়েছে। অনেক নারীই অপ্রত্যাশিতভাবে কিশোর বয়সী অনেক হামলাকারীর লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। লন্ডনভিত্তিক পর্যবেক্ষণ সংস্থা টেল মামার এক বার্ষিক রিপোর্ট অনুযায়ী, গত বছর প্রায় ১ হাজার ২০১টি রিপোর্ট অনুমোদনের জন্য জমা দেওয়া হয়েছে। এগুলো যাচাই করা হয়েছে। ২০১৬ সালের চেয়ে ২৬ শতাংশ বেশি মুসলিমবিরোধী হামলার সাক্ষী হয়েছে ব্রিটেন। এই সংস্থাটি এসব রেকর্ড রাখা শুরু করার পর থেকে এটাই সর্বোচ্চ সংখ্যা বলে জানানো হয়েছে। হামলার শিকার ১০ জনের মধ্যে ৬ জনই নারী এবং ১০ জনের মধ্যে ৮ জন হামলাকারীই পুরুষ। এদের বয়স ১৩ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে। এ প্রসঙ্গে টেল মামার পরিচালক ইমান আত্তা বলেছেন, আমরা সত্যিই খুব উদ্বিগ্ন যে, আমাদের তরুণ প্রজন্ম বিশেষ করে ছেলেরা মুসলিমদের প্রতি হামলায় অনেক বেশি আক্রমণাত্মক হয়ে উঠেছে।

ইসলাম ও মুসলমানদের নিয়ে অপপ্রচারের কারণে বিভ্রান্তির সংখ্যাও বাড়ছে। গত বছর কানাডার কুইবেক শহরের মসজিদে গুলি করে ৬ মুসলিমকে হত্যার ঘটনা ঘটে। এতে রাজ্যের কট্টরপন্থি রেডিও স্টেশনগুলো তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে। এই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী নিজেও তখন রেডিও স্টেশনগুলোর সমালোচনা করেন। স্থানীয়ভাবে এই স্টেশনগুলো ‘ট্র্যাশ রেডিও’ নামে পরিচিত। এই রেডিও স্টেশনগুলো টক শো এবং বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে স্থানীয় সমাজে ইসলাম ফোবিয়া ছড়াচ্ছিল। সমালোচকরা আগে থেকেই অভিযোগ করে আসছিলেন, এসব স্টেশনে সম্প্রচারিত টক শোগুলোর আলোচনা বিভক্তির সৃষ্টি করছে এবং এর সুযোগ নিয়ে কট্টরপন্থি মতাদর্শ উজ্জীবিত হয়ে উঠছে। এ নিয়ে কুইবেকের লাভা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞানী স্টিফেন লেমান-ল্যাংলয়েস বলেছেন, ডানপন্থি রেডিও স্টেশনগুলোর সারবস্তু খুব সামান্যই। সংখ্যালঘু এবং মুসলিমদের নিয়ে বিভিন্ন ধরনের কথাবার্তা বলে এরা সমাজে বিভেদ বাড়িয়ে দিচ্ছে। তারা শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যসহ নানা বিষয়ে কথা বলে কুইবেকে চরমপন্থা ছড়িয়ে দেয়।

ইসলাম-ফোবিয়ার জন্য অপপ্রচার যেমন দায়ী, তেমনি বিভিন্ন ধর্মের ডানপন্থিরাও দায়ী। তারা সহজেই সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করছে। এটা কমাতে হলে সমাজের মেলবন্ধন জোরদার করতে হবে। মানুষে মানুষে যোগাযোগ বাড়াতে হবে। আশার কথা হচ্ছে, এ ধরনের উদ্যোগও কিন্তু রয়েছে পশ্চিমের অনেক রাষ্ট্রে। কোথাও সরকারিভাবে কাজ হচ্ছে। কোথাও নাগরিক সমাজ উদ্যোগী হয়েছে। কোথাও আবার ইসলামিক সংগঠন এগিয়ে এসেছে। যেমন- মুসলিমদের সম্পর্কে ভুল ধারণা দূর করতে দারুণ ভ‚মিকা রাখছে মেলবোর্নের ইসলামিক মিউজিয়াম। বিংশ শতকে এসে অস্ট্রেলিয়ার অর্থনীতির উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে সেখানে অভিবাসী শ্রমিকের চাহিদা বাড়তে থাকে। সে কারণে তুরস্ক, আলবেনিয়া, বসনিয়া এবং লেবাননের মুসলিমরাও অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমাতে শুরু করেন। নানা ধর্মের মানুষের সমাগমে অস্ট্রেলিয়া বহু জাতির দেশে পরিণত হয়। সেখানে এখন ৭০ এর ওপর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এবং ১২০টির বেশি ভাষার মানুষ বাস করেন। মোট জনগোষ্ঠীর দুই শতাংশের কম মানুষ মুসলিম হলেও অস্ট্রেলিয়ার ব্যবসা, শিল্প-সাহিত্য, রাজনীতি এবং গণমাধ্যমে তারা এখন গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রাখছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে নাইন-ইলেভেনের সন্ত্রাসী হামলার পর সারা বিশ্বে ইসলাম-ফোবিয়া (মুসলিম-ভীতি) বেড়েছে। অস্ট্রেলিয়াও এর বাইরে নয়। অন্য ধর্মের সাধারণ মানুষের মধ্যে ভীতি ছড়িয়ে পড়ে। সেই ভীতি এখনো কম-বেশি বিদ্যমান। মুসলমান মানেই যে সন্ত্রাসী নয় এ ধরনের বক্তব্য প্রচার করতে গেলে পাল্টা যুক্তি শুনতে হয়। এ অস্বস্তি কাটাতে মুসলমানরা নিজেদের কমিউনিটির মধ্যে এবং মুসলমানদের প্রতি সহনশীল অন্য কমিউনিটির মানুষের সঙ্গে আলোচনা করে ইসলাম সম্পর্কে ইতিবাচক প্রচার-প্রচারণার উদ্যোগ নেয়। বছর চারেক আগে মেলবোর্নে প্রতিষ্ঠা করা হয় ‘ইসলামিক মিউজিয়াম, অস্ট্রেলিয়া।’ এ মিউজিয়াম প্রতিষ্ঠায় কমিউনিটির সদস্যরাই প্রাথমিকভাবে অর্থ জোগান দেওয়া শুরু করেন। পাশাপাশি সেখানকার মুসলমানরা যেসব দেশ থেকে অভিবাসী হয়ে এসেছেন সেসব দেশের বিত্তবানদের কাছে সহায়তার আবেদন জানান। ইসলাম কী, এই ধর্মের সঙ্গে অন্য ধর্মের মিল কোথায়, সভ্যতার অগ্রগতিতে মুসলমানরা কী কী অবদান রেখেছেন- এরকম নানা ইতিবাচক বিষয় ইসলামিক মিউজিয়ামে স্থান পেয়েছে। মিউজিয়ামের মন্তব্য বই থেকে জানা যায়, বেশিরভাগ মানুষই ইসলাম সম্পর্কে ভুল জানতেন বা অনেক কম জানতেন। মুসলিম, অমুসলিম নির্বিশেষে এরকম মন্তব্য এসেছে। তাদের অনেকে ইসলাম-ফোবিয়ার কারণে মুসলমানদের এড়িয়ে চলতেন বা মিউজিয়ামে যেতে অনাগ্রহী ছিলেন। কিন্তু তাদের সেই ভুল ভাঙতে শুরু করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগানের ডিয়ারবর্নে গেলেও ইসলাম সম্পর্কে ভুল থেকে বের হয়ে আসতে পারবে অনেকেই। টুইন টাওয়ার হামলার পর এই শহর ইসলাম-ফোবিয়ার কারণে সবাই এর দিকে আঙুল তুলতে থাকে। শুরু হয় ইসলামবিরোধী আন্দোলন। কিন্তু ডিয়ারবর্নের বিপক্ষে অভিযোগ আনা ব্যক্তিরা হয়তো কখনোই ডিয়ারবর্ন যায়নি। কারণ এখানেই বিভিন্ন জাতীয়তার ও ধর্মের মানুষ একসঙ্গে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করে। মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকা ও যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরা একই সঙ্গে কোনো সংঘাত ছাড়া বছরের পর বছর ধরে এখানে বাস করছে। সম্প্রীতি আর সম্মিলনের এক ভিন্ন আমেরিকাকে দেখতে হলে ডিয়ারবর্ন যাওয়া দরকার ইসলামবিদ্বেষীদের। ইসলাম যে শান্তির ধর্ম, তার প্রমাণ অবশ্যই মিলবে সেখানে।

এদিকে মুসলিম ফুটবলারদের হাত ধরে ফ্রান্সে কমেছে ইসলাম-ভীতি। ২০১৮ সালের বিশ্বকাপ ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর ফ্রান্স দলের দুই ধর্মপ্রাণ মুসলিম খেলোয়াড় মাঠে আনন্দ প্রকাশ করেন সিজদা দিয়ে। বিশ্বকাপ জয়ী ফ্রান্সের ফুটবল দলে সাতজন মুসলিম খেলোয়াড় ছিলেন। একটি বিশ্বকাপ জয় অনেক সমস্যার সমাধান করে দিয়েছে ফ্রান্সে। তার মধ্যে অন্যতম হলো- দেশটিতে অহেতুক মুসলিম-ভীতি কমেছে। অভিবাসীদের দেশপ্রেম নিয়ে ওঠা প্রশ্নের উত্তর মিলেছে। দেশপ্রেমের প্রশ্নে তারা উত্তীর্ণ হয়েছে।

জার্মানির সরকার মুসলিম শরণার্থীদের প্রতি সহানুভ‚তিশীল। কিন্তু সেখানে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উগ্র ডানপন্থি ও পপুলিস্ট দলগুলোর দ্বারা ইসলামবিদ্বেষ ছড়িয়ে পড়েছে। যার কারণে অভিবাসীরা বিভিন্ন প্রোপাগান্ডার শিকার হচ্ছেন। এই পরিস্থিতির মোকাবেলায় জার্মানিতে প্রতিবছর ভিন্ন ধর্মের মানুষের জন্য বিশেষ একটি দিন মসজিদগুলোকে উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। প্রতি বছর এ দিনটিতে তাদের সঙ্গে আলাপ আলোচনার আয়োজন করা হয়। যাতে ইসলাম সম্পর্কে তাদের নেতিবাচক ভুল ধারণাগুলো দূর করা যায়। অন্য ধর্মাবলম্বীদের কাছে ইসলামের সৌন্দর্য-শোভা তুলে ধরা হয়। বিভিন্নভাবে ইসলামের যথার্থতা তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।

যুক্তরাজ্যে গত বছর মসজিদে কিছু হামলা হয়। এর প্রতিবাদে তখন মিছিল করে সেখানকার বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলনের কর্মীরা। বিভিন্নভাবে যারা মুসলিমবিদ্বেষের শিকার, তাদের পক্ষে সরব হন তারা। যুক্তরাজ্যের মুসলিম জনগোষ্ঠীর বাইরে সরকার থেকেও অপপ্রচার বন্ধে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। কাজ করছে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন। তারা আন্তঃধর্মীয় সম্পর্ক বাড়াতে যেমন কাজ করছে, আবার কেউ যাতে ডানপন্থা ও উগ্রবাদে না ঝুঁকে পড়ে, তার জন্যও সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।

ইতিবাচক দিক হচ্ছে, নানাবিধ কারণে আগের চেয়ে সচেতন হচ্ছে মানুষ। সহজে হুজুগে পা দিচ্ছে না। এটা মুসলমানদের ক্ষেত্রে যেমন সত্য। তেমনি সত্য অমুসলমানদের ক্ষেত্রেও। সন্ত্রাস তো জিহাদ নয়। আর সন্ত্রাসীরাও আসলে ইসলামের অনুসারী নয়। এই বিষয়টা ইউরোপ-আমেরিকার মুসলিম কমিউনিটির বহু নেতা ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রচার করছেন। এমনকি আলেম সম্প্রদায়ের মধ্য থেকেও কথাটা উঠেছে। অন্যদিকে এই মুসলিমবিদ্বেষ ছড়িয়ে পশ্চিমা যেসব শাসক সুবিধা নিতে চান, যেসব কট্টরপন্থি সংগঠন ফায়দা লুটতে চান, তারাও এখন আর আগের মতো জোরালো সমর্থন পাচ্ছে না। এটাই হচ্ছে আশার কথা। মুসলিম জনগোষ্ঠীকে কোণঠাসা করে পৃথিবী এগিয়ে যেতে পারবে না, এই বিষয়টি পশ্চিমের শাসকদের অবশ্যই উপলব্ধিতে রাখতে হবে। সৌজন্যে: ঢাকা টাইমস

লেখক: সাবেক রাষ্ট্রদূত এবং প্রধান তথ্য কমিশনার