বৃহস্পতিবার, ২৩ মে, ২০১৯ ইং ৯ জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ,১৭ রমযান, ১৪৪০ হিজরী

আমাদের সাহিত্যের হালচাল

AmaderIslam.COM
ডিসেম্বর ১১, ২০১৮
news-image

আফরোজা পারভীন : একসময় জানতাম শিল্প-সাহিত্য সাধনার বিষয়। গভীর মনোনিবেশ আর অনুশীলনে এর চর্চা করতে হয়, ভালোবাসতে হয়, পড়ালেখা করতে হয়। জীবনের অভিজ্ঞতা পঠন-পাঠন ভ্রমণ স্মৃতি সাহিত্যকে এগিয়ে নিয়ে যায়। আমাদের পূর্বসূরি সাহিত্যিকেরা তাই সাহিত্যকে ভালোবেসে পড়ালেখা করেছেন, নিজেদের সমৃদ্ধ করে লিখে গেছেন। অনেকে স্বীকৃতি পেয়েছেন, অনেকে পাননি। যারা পাননি তাদের সাহিত্য বৃথা হয়ে যায়নি। নিজেরা আনন্দ পেয়ে লিখেছেন। সেটাই তাদের প্রাপ্তি। আর প্রাপ্তি পাঠকদের যারা তাদের লেখা পড়েছেন, আলোচনা করেছেন, আনন্দ পেয়েছেন।

কালজয়ী লেখা আমরা সে লেখাকেই বলি, যে লেখা কাল থেকে কালে এগিয়ে যায়। বেঁচে থাকে সবকালের পাঠকদের মধ্যে, সমানভাবে আদৃত হয়। সে লেখক বেঁচে থাকুন বা নাই-ই থাকুন। সাহিত্যই তাদের বাঁচিয়ে রাখে।

এ কথা ঠিক, আগের দিনে কোনো লেখক পুরস্কার পাওয়ার আশায় লেখেননি। ওসব তাদের মাথাতেই ছিল না। সৃষ্টির তাড়নাতেই তারা লিখেছেন। জীবনানন্দ দাশের মতো লেখকও জীবিতকালে স্বীকৃতি পাননি। তাতে কিছু ক্ষতি বৃদ্ধি হয়নি। তিনি তাঁর মতোই লিখে গেছেন।
এ দেশের অনেক বড় বড় লেখক বাংলা একাডেমি পুরস্কারও পাননি। বাংলা একাডেমি পুরস্কারকে নাকি বলা হয় লেখকের মানদণ্ড নির্ণয়ের চাবি। সে চাবি অনেকে পাননি। অথচ তাঁরা অমন দশটা একাডেমি পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য। তাঁরা যে পুরস্কার পাননি সেটা নিয়ে তাঁরা মাথাও ঘাটাননি।
এখনকার লেখকেরা দুই দিনে বিখ্যাত হতে চায়। সিঁড়ি না বেয়ে টপকে উঠতে চায়। নিজের পয়সায় একখানা কবিতার বই বের করেই নামের সামনে ‘কবি’ জুড়ে দেয়। বলার সময়ও বলে, ‘আমি কবি অমুক’। একখানা গদ্যের বই লিখে সাহিত্যিক হয়ে যায়। সোচ্চারে সেটা বলেও বেড়ায়। প্রকাশকরা তাদের দিয়ে কিছু ব্যবসা করে নেয়। পত্রিকাগুলোতেও রয়েছে কোটারি। একটু লক্ষ করলে দেখা যায়, এক-একটি পত্রিকাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে একটি করে নির্দিষ্ট লেখকগোষ্ঠী। কী মানদণ্ডে তা জানা নেই। এ অচলায়তন ভাঙা প্রায়ই সম্ভব হয় না। আগে লেখকেরা পত্রিকা অফিসে যেতেন। গল্পগুজব করতেন। একটা মেলবন্ধন তৈরি হতো নিজেদের মধ্যে। সম্পাদকেরা লেখকদের চিনতেন। তাদের লেখা পড়ে সন্তুষ্ট হলে তবে ছাপতেন। তাই মফস্বল বা প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে লিখলেও লেখার মানগুণে সেটা ছাপা হয়ে যেত। এখনকার অনেক সম্পাদক পুরনো লেখকদের চেনেনই না। কতটা পড়েন তাও জানি না। আর এখন পত্রিকা অফিসগুলো এক একটা করপোরেট ভবন। উঠতে নামতে চেকিং, সিসি ক্যামেরা। কথা বলতে হয় রিসেপশনে বসে। হৃদয়ের কোনো যোগ নেই এখন। লেখা পাঠানো হয় মেইলে। হাতের ছোঁয়া নেই, পুরোটাই যান্ত্রিক। অনলাইনেরও ছড়াছড়ি। তাদের কটাইবা আমরা চিনি, আর কটার কথাইবা জানি। অন্য দিকে গজিয়ে উঠেছে শত শত সাহিত্য সংগঠন। এক একদিনে পাঁচ-সাতটা সংগঠনের সভা হয়। কে কোথায় যাবেন সেই দুশ্চিন্তায় থাকেন। বিশেষ করে বড় লেখকেরা। কেউ কেউ হয়তো দিনে ৪-৫টায় যান। এখানে আধঘণ্টা, ওখানে আধঘণ্টা এমনভাবে। এসব সংগঠনে কবিতা পড়ে বা কিছু আলোচনা করে ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে এক একজন কবি-সাহিত্যিক হয়ে যায়। আর প্রোগ্রাম লাইভ হলে তো কথাই নেই। এসব সংগঠন থেকে লেখকদের জন্মদিন পালন করা হয়, খাওয়া-দাওয়া হয়, পুরস্কারও ঘোষণা করা হয়। কিন্তু কাজের কাজ কতটা হয় সেটি ভেবে দেখার বিষয়।

আর ফেসবুক তো খুলে দিয়েছে কবি-সাহিত্যিক হওয়ার অবারিত দ্বার। যে যার ইচ্ছামতো কবিতা গল্প লিখে দু-চারটে সুন্দর পোজের ছবিসহ পোস্ট দিচ্ছে। দেদার লাইক পড়ছে, কমেন্টবক্স উপচে উঠছে। এরপর কী আর সাহিত্যিক হতে বাকি থাকে!

ফেসবুকের কারণে আর যাতায়াত বাড়ায় এপার বাংলা ওপার বাংলার দূরত্ব কমেছে। কবি-সাহিত্যিকেরা আসছেন, যাচ্ছেন, পুরস্কার নিচ্ছেন. ফেসবুকে পোস্ট দিচ্ছেন। সাহিত্যের মান কতটা বাড়ছে জানি না। এমনকি বিদেশ থেকেও কবি সাহিত্যিকেরা আসছেন নানান অনুষ্ঠান উপলক্ষে। কবিতা বা লেখা পড়ে বক্তৃতা দিয়ে যাচ্ছেন। আমাদের রথী-মহারথীদের কেউ কেউ যাচ্ছেন। কিন্তু আমাদের লেখা বাইরে কতটা যাচ্ছে বা অনুবাদের ব্যাপারটা কতটা এগোচ্ছে এ ব্যাপারে কাউকে জোরেশোরে কথা বলতে দেখছি না।

এখন সাহিত্যে ঢুকে পড়েছে রাজনীতি। কিছুসংখ্যক আছেন আওয়ামী লেখক, কিছু বিএনপির, আবার জামায়াতি লেখক বলেও চিহ্নিত আছেন কেউ কেউ। যে দল যখন ক্ষমতায় থাকে সেই দলের লেখকদের সুবিধা হয়। কিছু লেখক আছেন সর্বদলীয়। যখন বাতাস যে দিকে তারা সে দিকে। বদলাতে সময় লাগে না। কেউ কিছু বললেও তাদের আসে যায় না। দুই দিনের তৎপরতায় তারা খাঁটি লোক হয়ে যায়। এসব লেখকের যোগ্যতা থাকুক বা না থাকুক তারা টিভি চ্যানেলে ডাক পায়। তাদের নির্দেশে পরিচালিত হয় এ দেশের সাহিত্য। এরা বিদেশের সাহিত্য সম্মেলনগুলোতে যায়-আসে। বিভিন্ন জায়গায় বিচারক হয়। আর তাদের সুপারিশেই এদের প্রিয়ভাজনেরা সার্কসহ নানা সাহিত্য সম্মেলনে অংশ নেন।

আর এরাই সব সময় প্রশ্ন তোলে কে, কোন কাগজে লিখছে, কে আওয়ামী ভাবধারার, কে বিএনপি ভাবধারার আর কে জামায়াতি ভাবধারার। অথচ একসময় এসব কাগজে সুবিধামতো এরাও লিখেছেন এবং আমি নিশ্চিত সুবিধা বুঝলে ভবিষ্যতেও লিখবেন। কে কোন কাগজে লিখবে বা সব কাগজে লিখবে কি না এটি লেখকের নিজস্ব চিন্তা। আমার তো মনে হয়, লেখকের সেই কাগজেই লেখা উচিত যে কাগজ তার মতামতটিতে হাত দেবে না, তার লেখার একটা লাইনও কাটবে না, নিজস্ব মতামত স্বাধীনভাবে লিখতে পারবে। সেটা যদি ফুটপাথের কাগজও হয়, সেটিতেই লেখা উচিত।

দেশে এখন পুরস্কারের ছড়াছড়ি। বিভিন্ন ব্যাংক এখন বড় অঙ্কের টাকার পুরস্কার দিচ্ছে। পুরস্কার দিচ্ছে কিছু প্রতিষ্ঠানও। পাণ্ডুলিপি প্রতিযোগিতাও হচ্ছে। যে পাণ্ডুলিপি জিতছে সেগুলোকে পরবর্তী মেলায় প্রকাশ করা হচ্ছে। উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। কিন্তু এই যে সিলেকশন কমিটিতে কারা থাকেন, তাদের কোন বিবেচনায় নির্বাচন করা হয়, তারা কতটা নিরপেক্ষ সেটাও দেখার বিষয়। বড় অঙ্কের টাকার পুরস্কার ঘোষণা হওয়ায় কিছু লেখক পুরস্কার পাওয়ার তাড়নাতেই লেখেন, খোঁজখবর রাখেন, বই জমা দেন। এক একটা প্রতিষ্ঠান পাঁচ-সাত কপি করে বই জমা দিতে বলেন। এটাও তো লেখকদের জন্য কষ্টসাধ্য। লেখককে কেন বই জমা দিতে হবে? যারা পুরস্কার দেবেন তারা কি খুঁজে বের কতে পারেন না- কোন বইটি বা লেখক পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য। এতে যারা পুরস্কারপ্রত্যাশী তারাই পুরস্কার পান আর এক বিরাট সংখ্যক লেখক যারা জেনে বা না জেনে বই জমা দেন না, তারা থেকে যান পুরস্কারের বাইরে। একই ব্যবস্থা শিশু একাডেমির অগ্রণী ব্যাংক পুরস্কার, একুশে পদক ও স্বাধীনতা পদকের ব্যাপারে। অগ্রণী ব্যাংক পুরস্কারের জন্য লেখককে বই জমা দিতে হয়। আমার মতো লেখক যারা পত্রিকার বিজ্ঞাপন ফলো করেন না, বই জমা দেন না তারাÑ নিশ্চিত কোন দিনই পুরস্কার পাবেন না। একুশে পদক আর স্বাধীনতা পদকে নির্ধারিত ফরম পূরণ করে সুপারিশসহ ( একজন আগে পেয়েছেন এমন কারো) জমা দিতে হয়। কিন্তু কেন? রাষ্ট্র কি তার যোগ্য মানুষটিকে খুঁজে পুরস্কার দিতে পারে না। এ দেশে অনেক লেখক আছেন যাদের অর্থকষ্ট আছে, পুরস্কারের অর্থ পেলে তাদের কাজেও হয়তো লাগত। কিন্তু তারা এতটাই আত্মসম্মানী আর অত্মাভিমানী যে, নিজেরা ফরম পূরণ করবেন না, পুরস্কারও পাবেন না।

বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখকেরা তাদের পছন্দমতো নাম পাঠান নির্বাচনী বোর্ডের কাছে। কিন্তু এমন লোকও পুরস্কার পায়, যে পুরস্কার পাওয়ার পর শিশুসাহিত্যিক হয়। আজকাল আবার জোড়ায় জোড়ায় পুরস্কার পায়। আর প্রতিবারই পুরস্কার ঘোষণার পর কথা ওঠে, পুরস্কার হয়ে পড়ে প্রশ্নবিদ্ধ।

বাংলা একাডেমির মূল কাজ গবেষণা। সেটা কতটা হচ্ছে তা জানি না। তবে এখানে এখন ‘হে ফেস্টিভাল’ হচ্ছে, ‘লিটফেস্ট’ হচ্ছে। সেখানে মনীষা কৈরালা ও নন্দিতা দাসরা আসছেন। সঞ্চালকও আসছেন বিদেশ থেকে। সেসব ফেস্টিভালে আলোচনা করার সুযোগ পাচ্ছেন মুখ চেনা কিছু মানুষ যাদের একাডেমিতে যাতায়াত আছে বা আয়োজকদের যারা ঘনিষ্ঠ। আমি যোগ্য ব্যক্তিদের কথা বলছি না। যোগ্যতা বলেই তারা যান। কিন্তু যারা আলোচনা করে বা করেছে সবাই কি যোগ্য? ওদের চেয়ে ভালো কেউ কি ছিল না? আর লিট ফেস্টের কথাই বা বলি কেন, বাংলা একাডেমিতে বছরব্যাপী যেসব অনুষ্ঠান হয় তাতেও তো সেই মুখ চেনা কিছু মানুষের আনাগোনা।
বাংলা একাডেমি পুরস্কারের বাইরেও এখন বাংলা একাডেমি থেকে দেয়া হয় অনেক অনেক পুরস্কার। আমি জানি না, এটা কেন করা হয়। যাদের নামে পুরস্কারগুলো দেয়া হয় তারা নামকরা লোক আর তাদের পরিবার পয়সা দেয় বলেই পুরস্কার দিতে হবে! কেন তারাই তো ফাউন্ডেশন বানিয়ে সেগুলোর ব্যানারে পুরস্কার দিতে পারে। এটার সাথে বাংলা একাডেমিকে কেন জড়ানো আর বাংলা একাডেমিই বা কেন জড়ায়? এতে যে বাংলা একাডেমি পুরস্কারের মান পড়ে যায় তা-কি কেউ ভেবেছেন? এই গতবার যখন একাডেমি পুরস্কার দেয়া হলো, আমি এক বন্ধুকে বলাতে সে বলল, ‘না না পুরস্কার তো আরো আগে দেয়া হয়ে গেছে। ওমুক ওমুক পেয়েছে।’ ডিসেম্বর মাসে এজিএমের সময় যে পুরস্কারগুলো দেয়া হয় সেগুলোকেই অনেকে এখন বাংলা একাডেমি পুরস্কার ভাবতে শুরু করেছে।

এজিএমের কথা যখন এলো আর একটু বলি। আমি যখন বাংলা একাডেমির সদস্য হওয়ার জন্য আবেদন করি, তখন অনেক বই জমা দিতে হয়েছিল। অনেক দিন অপেক্ষা করতে হয়েছে। তার পর সাধারণ সদস্য হয়েছি। তার পরও বেশ কয়েক বছর অপেক্ষা করে, বারবার আবেদন করেছি।

চাঁদা দিতে ভুলে যাওয়ায় একবার নাম কাটা যাওয়ায় এজিএমএ ব্যাগ পাইনি। তারপর একসময় জীবন সদস্য হয়েছি। কিন্তু এখন কিছু মানুষ সরাসরি জীবন সদস্য হন। তাদের বইপত্র নেই বা থাকলেও একটা দুটো অনুল্লেখ্য বই, বড় আমলা রাজনীতিবিদ বা বুদ্ধিজীবী অর্থাৎ বলার মতো তেমন কিছু নেই, যাতে একবারে জীবন সদস্য হওয়া যায়। আর জীবন সদস্য হয়েই তারা এজিএমে বক্তৃতা দিতে শুরু করেন নিজেদের ঢোল বাজিয়ে। এরা কোন যোগ্যতায় জীবন সদস্য হন, কারো আত্মীয়, কারো বন্ধু নাকি অন্য কিছু জানতে ইচ্ছে হয়।

আগে বাংলা একাডেমির এজিএমে কদাচিৎ পুলিশ দেখেছি। মন্ত্রীরা গেলেও পুলিশ থাকত দূরে। অর্থমন্ত্রী, সংস্কৃতিমন্ত্রী দুজনকেই আমি দেখেছি পুলিশবিহীনভাবে প্যান্ডেলে বসতে, ঘুরে বেড়াতে। পুলিশ থাকলেও পেছনে কোথাও হয়তো ঘাপটি মেরে থেকেছে। কিন্তু এখন প্যান্ডেলে ছোটখাটো মাপের কোনো কেউকেটা আসার আগে পুলিশ আসে। আবার খাবার সময় লেখকরা দাঁড়িয়ে থাকে। পুলিশরা কেউকেটার ছেলে বা মেয়েকে নিয়ে এক টেবিলে বসে খায়। যদিও বাংলা একাডেমির দাওয়াতপত্রে লেখা থাকে সদস্য ছাড়া কেউ আসবেন না। হ্যাঁ, পুলিশরাও মানুষ, তাদের খাওয়ানো যেতেই পারে। কিন্তু সেটা লেখকদের দাঁড় করিয়ে রেখে নয়। যারা তাদের বডিগার্ড বা সিকিউরিটি সাথে করে আনেন তাদেরই তো উচিত বাংলা একাডেমির সম্মান আর লেখকদের মর্যাদার কথা চিন্তা করে এদের ব্যাপারে ভিন্ন ব্যবস্থা নেয়া।

আজকাল সাহিত্য হয়ে গেছে সংগঠনভিত্তিক, যা আগেই বলেছি। প্রায়ই দেখি কারো না কারো বাসা, বারান্দা, ছাদ বা কোনো হলে সাহিত্য অনুষ্ঠান হচ্ছে। দেদার খানাপিনা চলছে সেখানে। তাদের কেন্দ্র করেও গড়ে উঠছে এক-একটি গোষ্ঠী। পুরস্কার দেয়ার প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত এমন কিছু মানুষ এগুলোর কোনো কোনোটিতে যুক্ত হচ্ছেন। লেখকেরা তাদের বাড়িতে দাওয়াত দিচ্ছেন, খাওয়াচ্ছেন এবং উপহার দিচ্ছেন। পুরস্কারের মওসুম এলে এটা ঘটছে বেশি বেশি করে। মোড়ক উন্মোচনের নামেও এ তোয়াজ কালচার চলছে। এমনকি ঢাকা কাবেও মোড়ক উন্মোচনে খানাপিনা হচ্ছে, পুরস্কারও জুটছে। যারা এসব করছেন, যোগাযোগ রাখছেন তারাই টিভিতে যাচ্ছেন, কেউ কেউ সঞ্চালক হয়ে নিজেদের পছন্দের লোকদের ডাকছেন। টেলিভিশনেও তাদের রাজপাট। কেউ এই জাতীয় প্রতিষ্ঠানে চাকরি নিচ্ছেন, মন্ত্রীর পাশে বসে মোটা বেতন, গাড়ি ও বাড়ি পেয়ে আত্মপ্রসাদ লাভ করছেন।

নামসর্বস্ব অনেক প্রতিষ্ঠানও লেখকদের টাকায় হল ভাড়া করে তাদের ক্রেস্ট সার্টিফিকেট দিচ্ছেন। সে অনুষ্ঠানে মন্ত্রী বা বড়োসড়ো কোনো বুদ্ধিজীবী আসছেন। সংগঠনটির কর্ণধার তাদের পাশে বসে ধন্য হচ্ছেন। ভিডিও এবং লাইভ হচ্ছে। সংগঠনটির নাম জনগণ জানছে। আর ওই লেখক তার নিজের টাকায় কেনা ওই ক্রেস্ট বাসার কোনো দৃশ্যমান স্থানে রেখে অশেষ আত্মতৃপ্তি লাভ করছেন।
জীবনানন্দ দাস, বিভূতিভূষণ, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়সহ অনেক বড় লেখক কোনো সংগঠনে গিয়ে কবিতা-গল্প পড়েননি। পুরস্কারের জন্য ধরনা দেননি। আমাদের দেশের কবি জসীম উদ্দীন, মাহমুদুল হক, শহীদুল জহির বাংলা একাডেমি পুরস্কার পাননি। আহমদ ছফা বাংলা একাডেমি প্রদত্ত সাদাত আলি আখন্দ পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেছেন। কিন্তু জসীম উদ্দীনের ‘নকশী কাঁথার মাঠ’, মাহমুদুল হকের ‘জীবন আমার বোন’ আর শহীদুল জহিরের ‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’ কোনো পুরস্কারের ধার না ধেরে অমর হয়ে আছে। হয়েছে কালোত্তীর্ণ। আহমদ ছফার মতো চিন্তক লেখক ‘যদ্যপি আামার গুরু’র মতো অনেক লেখার তার স্বমহিমায় দীপ্ত হয়ে আছেন।
সাহিত্য নিরলস সাধনার জিনিস, নিজের বুকে ধারণ করার জিনিস। যে তা করে না, দশটা, বিশটা, একশটা পুরস্কার তাকে লেখক বানাতে পারবে না, আমি নিশ্চিত। (সৌজন্যে: নয়া দিগন্ত)